দিনেদুপুরে রাজধানীতে ১০টি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনও ফের উত্তপ্ত হচ্ছে। তবে বাসে আগুনের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আগাম কোনো তথ্য ছিল না। কেন তথ্য ছিল না তার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মনে করছে, ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ে বিএনপির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা নাশকতার এ পথ বেছে নেয়। আগামী ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের বর্ষপূর্তি সামনে রেখে বড় ধরনের ‘নাশকতার ছক’ কষেছে দুর্বৃত্তরা এসব তথ্য পেয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ইতিমধ্যে নাশকতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। সব জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশ সদর দপ্তর বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে বলে পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে ঢাকায় বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তারদের থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিএনপির একাধিক শীর্ষনেতা ফেঁসে যাচ্ছেন। এমনকি কার নেতৃত্বে আগুন দেওয়া হয়েছে, তার পরিচয়ও উদ্ঘাটন করা হয়েছে। বাস পোড়ানোর ঘটনায় ঢাকার বিভিন্ন থানায় ১৪টি মামলায় এ পর্যন্ত ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের জানান, বাসে আগুন দেওয়া প্রত্যেককে আইনের মুখোমুখি হতে হবে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ওরা সবসময় এগুলো করার চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। এবারই কয়েকটি বাসে তারা আগুন দিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ফোনালাপে দেখা যায়, ঢাকা-১৮ আসনে উপনির্বাচনে ভোটের ফলাফল মেনে নিতে না পেরে তারা (বিএনপি) এমনটি করেছে। পরাজিত হলেই দলটি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। ভিডিও ফুটেজ থেকে অগ্নিসংযোগকারী কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো বিশ্লেষণ করে ঘটনার হোতাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। নিরাপত্তা বাহিনী তৎপর রয়েছে। সামনে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গোয়েন্দাদের কোনো ব্যর্থতা নেই। তারা তৎপর বলেই এখন দেশ শান্তিতে রয়েছে। দেশে আমরা কোনো অরাজক পরিস্থিতি হতে দেব না। সরকারি এজেন্টরা বাসে আগুন দিয়েছে বিএনপি মহাসচিবের এ বক্তব্যের কোনো সত্যতা নেই।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, হঠাৎ করে গত ১২ নভেম্বর ঢাকায় ১০টি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এরপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা পরস্পরকে দোষারোপ করে বক্তব্য দেন। তবে এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। পুলিশ ও র্যাবের শীর্ষ কর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। নাশকতা প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন তারা। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তকারী একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাসে আগুন লাগার ঘটনার বিষয়ে আমাদের কাছে আগাম কোনো তথ্য ছিল না। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও আগাম তথ্য দিতে পারেনি। তবে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছেÑ আগামী ৫ জানুয়ারি সামনে রেখে নাশকতা করতে পারে সরকারবিরোধীরা। এজন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগই বিএনপির নেতাকর্মী। জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা ফেঁসে যেতে পারেন। জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরাও ঘাপটি মেরে আছে।’
কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে গত শুক্রবার বলেন, ‘বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা জামায়াত-শিবিরের নাশকতা কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো কিছু উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রাথমিকভাবে বোঝা যাচ্ছে, এটি বিএনপি-জামায়াতের আগুনসন্ত্রাসের ধারাবাহিকতা। আমরা একটি কল রেকর্ড পেয়েছি, এটি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এখানে যারা কথা বলেছেন, তাদের পরিচয় উদ্ঘাটনে কাজ চলছে। কল রেকর্ডটি মামলা প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজে দেবে। কল রেকর্ড এবং আগুনের ঘটনার সঙ্গে কথোপকথনের মিল রয়েছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নাশকতার ছকের ব্যাপারে সরকারের একাধিক সংস্থা প্রতিবেদন পাঠিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফেনী, রাজশাহী, নওগাঁ, রংপুর, নাটোর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, লালমনিরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট, সিলেট, মৌলভীবাজার, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ঝালকাঠি, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবান, জামালপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে পারে সরকারবিরোধী দুর্বৃত্তরা। গ্রামাঞ্চলে নাশকতা প্রতিরোধে গ্রাম পুলিশের টহল বাড়াতে সবকটি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাতের বেলায় পুলিশ ও র্যাবের টহল বাড়াতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শতাধিক শিবির ক্যাডার জামিনে বের হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। তাদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পুলিশের শীর্ষ কর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। বৈঠকে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো ও দুবৃর্ত্তদের ধরতে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে পুলিশের সবকটি রেঞ্জ ও সব এসপিদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।