চূড়ান্তভাবে ঘোষণার অপেক্ষায় থাকা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপকমিটিগুলোতে সদস্য পদে কোনো গণমাধ্যমকর্মীকে না রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল বৃহস্পতিবার দলের সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় ওবায়দুল কাদের সহকর্মীদের এ নির্দেশনা দেন বলে সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তবে তার এই নির্দেশনার বিষয়ে বৈঠকে দু’জন সম্পাদক ঘোরতর আপত্তি জানান বলেও একাধিক নেতা জানিয়েছেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের সম্পাদকমণ্ডলীর এই বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে দলের সভাপতি শেখ হাসিনাও বক্তব্য রাখেন।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, দলের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস গণমাধ্যমকর্মীদের উপকমিটিতে না রাখা সংক্রান্ত ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনার ব্যাপারে আপত্তি তোলেন। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ পেশাজীবীরা থাকতে পারলে সাংবাদিকরা কেন থাকতে পারবে না? তাছাড়া ছাত্রলীগ যারা করে এসেছে, আওয়ামী লীগের আদর্শের যারা তাদের ব্যাপারে আমরা ভাবতেই পারি।’ এ সময় মৃণাল কান্তি একজন সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘ওই সাংবাদিককে আপনি চেনেন। তাদের মতো কাউকে রাখা যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘চলতি বছর মুজিববর্ষ। সাংবাদিকদের রাখা হলে এ বছর ব্যতিক্রম কিছু কাজও তাদের দিয়ে করা সম্ভব হবে।’
মৃণাল কান্তিকে সমর্থন করে গণমাধ্যমকর্মীদের উপকমিটিতে রাখার পক্ষে মত দিয়ে পরে আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনও কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদেরকে আমরা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে পারব। তাদের চিন্তাশীল মনোভাব দলের কাজে আসবে।’
জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগে ত্যাগী, পরিশ্রমী অসংখ্য নেতাকর্মী রয়েছেন। তাদের বিষয়টাও আমাদের ভাবতে হবে। এ ছাড়া আমাদের সমালোচনামুক্ত থাকতে হবে।’
আগামী দু-একদিনের মধ্যে উপকমিটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘কোনো একজন একাধিক পদে থাকতে পারবে না। মহানগরসহ সহযোগী সংগঠনগুলোতেও যদি কোনো ব্যক্তির সদস্য পদ থাকে তবে তিনি সাব-কমিটিতে থাকতে পারবেন না।’
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন আওয়ামী লীগের উপকমিটির বর্তমান ও সাবেক কিছু সদস্য। যাদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোক রয়েছেন। এদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউবা আবার মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, এরা প্রায় সবাই হাইব্রিড। দলের দুঃসময়ের কর্মী নন। আর শুরু থেকেই কমবেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে দলের বিষয়ভিত্তিক এ উপকমিটিগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে উপকমিটি সংক্রান্ত যে দুটি নাম নিয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে তাদের মধ্যে অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনালের মালিক শারমিন জাহান রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন তিনি। তিনি আওয়ামী লীগের গত কমিটির (২০১৬-২০১৯) মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদসহ বহুমাত্রিক জালিয়াতিতে গ্রেপ্তার হওয়া মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমও দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির (২০১৬-২০১৯) সদস্য ছিলেন। এ রকম আরও কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি আওয়ামী লীগের এই কমিটির বিভিন্ন উপকমিটিতে ছিলেন।
আওয়ামী লীগের উপকমিটি গঠনের এই প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৯-এর সম্মেলন থেকে। নিয়মানুযায়ী, প্রতিটি সম্পাদকীয় পদের সঙ্গে পাঁচজন সহসম্পাদক নিয়ে সে বিষয়ে একটি উপকমিটি করার বিধান করা হয়। যাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সদস্য হিসেবে রেখে ওই বিষয়ে কাজ করার কথা ছিল।
প্রথমবার অনেকে এই পদ পেলেও পরের বার ২০১২-এর সম্মেলনে উপকমিটির সহসম্পাদকের পদ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। তখন প্রতিটি বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকীয় পদের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৫ জন বিবেচনায় ৯৫ জন সহসম্পাদক রাখার বিধান করা হয়। ২০১২ সালে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পর ৬৩ জন সহসম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এর পর থেকে এখন পর্যন্ত সহসম্পাদক পদ বা উপকমিটি নিয়ে বিতর্ক চলছেই। কখনো এটা গঠন নিয়ে, কখনো এর পদধারীদের নিয়ে। কেননা ২০১২ সালে সৈয়দ আশরাফ ৬৩ জনের নাম ঘোষণা করার বেশ কিছু দিন পর তৎকালীন এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে এ পদে প্রায় ৭০ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। যদিও তাদের দেওয়া চিঠিতে দলের সভাপতির স্বাক্ষর ছিল। তবে দলীয় কার্যালয় থেকে এ প্রক্রিয়া না হওয়ায় এ নিয়ে সমালোচনা হয়। এরপর ২০১৬ সালে সহসম্পাদক পদ নিয়ে সমালোচনা পরিপূর্ণতা লাভ করে। সেবার সম্মেলনের পর দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদকের স্বাক্ষরে কাগজে-কলমে ৪১৬ জনকে সহসম্পাদক পদ দেওয়া হয়। যদিও তখন বলা হয়েছিল, এর সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এতে অসংখ্য বিতর্কিত ব্যক্তি প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রের সংশ্লিষ্টতা পায়। এরপর ২০১৯-এর সম্মেলনে এত সংখ্যক সহসম্পাদক না হলেও বিতর্কিতদের এ পদ দেওয়ার ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন থাকে।