ধর্ষণ মামলার পর আসামিপক্ষের আবেদন ও বাদীর আপত্তি না থাকায় আদালতের সম্মতিতে ফেনী জেলা কারাগার ও নাটোরে আদালত চত্বরে আসামি ও ভুক্তভোগীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ দুটি বিয়ে উভয় পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলায় কারাগারে থাকা আসামি জহিরুল ইসলাম জিয়ার সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে ফেনী জেলা কারাগারে। আর নাটোরে আদালত চত্বরে ভুক্তভোগীর সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পরই জামিন পান আসামি মানিক হোসেন।
কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়নে কারাফটকে গতকাল দুপুরে কারাবন্দি জিয়া ও ওই তরুণীর মধ্যে ৬ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে সম্পন্ন হয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুজ্জামানসহ কারা কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সকালে পরিবার-পরিজন নিয়ে কারাগারে আসেন তরুণী ও তার পরিবারের সদস্যরা। ছিলেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরাও। দুপুরে জেলা কারাগারের জেলার শাহাদাৎ হোসেনের অফিসকক্ষে অবস্থান করেন তারা। আগে থেকে ওই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন জহিরুল হক জিয়া। বিয়ে শেষে উভয় পরিবারের সদস্যরা মিষ্টিমুখ করেন।
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিম চরদরবেশ গ্রামের স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু সুফিয়ানের ছেলে জিয়া তার প্রতিবেশী তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগ করা হয়েছে, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেন জিয়া। বিয়ে না করায় চলতি বছর ২৭ মে তরুণী বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় ধর্ষণ মামলা করলে পুলিশ জিয়াকে গ্রেপ্তার করে। পরে পুলিশের তদন্ত শেষে ৩০ জুন আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। গত ১ নভেম্বর আইনজীবী ফারুক আলমগীর চৌধুরী কারাবন্দি জিয়ার পক্ষে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন। আবেদনে দুজনের বিয়ের বিষয়ে উভয় পরিবারের সম্মতি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি আবেদনটি শুনানির জন্য উঠলে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ আসামির আইনজীবীকে শর্ত দিয়ে জানায়, বিয়ের বিষয়ে উভয়পক্ষের সম্মতি থাকলে এবং ফেনী জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ বিয়ে সম্পন্ন করে ৩০ দিনের মধ্যে আদালতকে অবহিত করলে তবেই জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। হাইকোটের এ আদেশের অনুলিপি গত ১১ নভেম্বর ফেনী জেলা কারাগারে পৌঁছলে বিয়ের আয়োজন করে কারা কর্তৃপক্ষ।
জেলা কারাগারের সুপার আনোয়ারুল করিম জানান, উভয় পরিবারের উপস্থিতিতে তাদের সম্মতিক্রমে কারাবন্দি জহিরুল হক জিয়া ও তরুণীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে আইনজীবী রফিকুল ইসলাম খোকন, নুরুল ইসলাম সোহাগ, কাজি বুলবুল আহমদ সোহাগ, চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ভুট্টু, কারা কর্তৃপক্ষের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে উভয় পরিবারের সম্মতির স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী বিয়ের কাবিনসহ যাবতীয় তথ্যাদি হাইকোর্টে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি। বিয়ে সম্পন্নের পর কারাফটকের সামনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ওই তরুণী উচ্চ আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, হাইকোর্টের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পেয়েছি, আমার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুন্দর সংসার জীবন গড়তে আমি সবার দোয়া চাই এবং একই সঙ্গে আমার স্বামীর দ্রুত মুক্তি চাই।’ তরুণীর বাবা আবদুল হাই ও জহিরুল ইসলাম জিয়ার বাবা আবু সুফিয়ান মেম্বার অভিন্ন সুরে বলেন, কুচক্রী মহলের চক্রান্তে আমরা বিভ্রান্ত ছিলাম। আদালতের আদেশে ছেলেমেয়ের বিয়ে হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা তারা উভয়ে দাম্পত্য জীবনে সুখী হবে।
এদিকে নাটোরে একটি ধর্ষণ মামলায় আদালত চত্বরে আসামি মানিকের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর আসামির জামিন মঞ্জুর করে জেলা ও দায়রা জজ আদালত। গতকাল দুপুরে আদালত চত্বরে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, নাটোরে গুরুদাসপুর উপজেলায় বিয়ের প্রলোভনে ওই এলাকার মানিক নামে এক যুবক গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে স্থানীয় এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও তার নগ্ন ভিডিও ধারণ করে। মেয়েটি বিয়ের জন্য চাপ দিলে কাজি ডেকে আনার কথা বলে মানিক পালিয়ে যায়। পরে নগ্ন ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। ওই ঘটনায় গত ১৯ অক্টোবর ভুক্তভোগী বাদী হয়ে গুরুদাসপুর থানায় ধর্ষণ মামলা করে। ওইদিনই মানিককে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ।
গতকাল মামলার শুনানির দিনে আসামিপক্ষের আইনজীবী মঞ্জুরুল ইসলাম জামিনের পাশাপাশি আদালতে আবেদনে এই বলে অবহিত করেন যে, উভয় পরিবার বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে। শুনানি শেষে নাটোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবদুর রহমান সরদার বিয়ের বিষয়ে সম্মতি দেন এবং বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর মানিকের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন। এদিকে আদালত চত্বরে বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। আদালতের এ সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। এ সময় আদালতে বাদী এবং আসামিপক্ষের আত্মীয়স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।