বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ভাবমূর্তি ফেরাতে চায় আওয়ামী লীগ

ক্ষমতার একযুগে দলের বিভিন্ন স্তরের পদধারী একাধিক নেতার  বিতর্কিত কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে নানা মহলে সমালোচিত করেছে। দুর্নীতি, অনিয়ম, দখলদারিত্ব ও ক্ষমতার প্রভাব দেখানোসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্ষমতাসীন দল ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতানেত্রীর নাম বারবার উঠে এসেছে। বিশেষ করে ক্যাসিনো কারবারে ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠন যুবলীগ নেতাদের সম্পৃক্ততা, ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতা শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়াকাণ্ড ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলে দেয়। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সমালোচনার জন্ম দেন আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির বর্তমান ও সাবেক কিছু সদস্য। এসব নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়া আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ফেরাতে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে।

দলের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমে সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ও শ্রমিক লীগের সম্মেলন সম্পন্ন করা হয়। তারপর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটিসহ সারা দেশের বেশ কিছু জেলা সম্মেলন হয়। এসব সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে বেশ কিছুদিন সময় নেওয়া হলেও খুব বেশি বিতর্কিতদের এসব কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়নি বলে মনে করছেন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। মোটা দাগে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের দিয়েই কমিটি গঠন হয়েছে বলে মত তাদের। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বিতর্কিত কাউকে পদ-পদবি না দেওয়া। সে অনুযায়ী এ পর্যন্ত যতগুলো কমিটি করা হয়েছে তার কোথাও কোনো বিতর্কিতকে স্থান দেননি তিনি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা বিষয় লক্ষণীয় যে এবার সবগুলো কমিটি যাচাই-বাছাই করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ খসড়া কমিটি করে দলীয় সভাপতির কাছে জমা দেন। তারপর যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করা হয়। এরপরই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে ঘোষিত বিভিন্ন কমিটিগুলো।’

তিনি আরও বলেন, ‘এবার মূল লক্ষ্যই ছিল বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব উপহার দেওয়া। এখন পর্যন্ত সেটা করা সম্ভব হয়েছে।’

প্রায় একই ধরনের মত প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত সর্বস্তরের কমিটিতে সৎ, যোগ্য ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই কাজ তদারকি করেছেন গুরুত্বের সঙ্গে। ফলে পরিচ্ছন্ন কমিটি উপহার দেওয়া সম্ভব হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দ্বন্দ্ব, কোন্দল ও বিভেদমুক্ত আওয়ামী লীগ দেখতে চান। এরই অংশ হিসেবে বিভেদপূর্ণ জেলাগুলোকে সতর্ক করার জন্য গত বৃহস্পতিবার একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আওয়ামী লীগ। আপনারা দেখেছেন নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী আগামীর আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে চান।’

দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সৃষ্টি করে। খেয়াল করলে দেখবেন যে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের যেসব কমিটি করা হয়েছে, সেখানে পরিচ্ছন্ন ও নতুন নেতৃত্ব তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।’

সংগঠন ও নেতৃত্ব শক্তিশালী হলে সরকারও শক্তিশালী হয় বলেও মন্তব্য করেন দলটির জ্যেষ্ঠ এই নেতা।

জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি দলের প্রায় সব স্তরের নেতাই সংগঠনের সর্বস্তরে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ফেরানো জরুরি বলে মনে করছেন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে পরিশুদ্ধ করতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাই বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব গঠনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বদ্ধপরিকর। এর ফলে তরুণ নেতৃত্ব কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।’

প্রায় একই ধরনের মত প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সর্বস্তরে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি আনয়ন জরুরি। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা উচিত।’

শুদ্ধি অভিযানে এসেছে যেসব পরিবর্তন

কৃষক লীগ : গত বছরের ৬ নভেম্বর কৃষক লীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিল অধিবেশনে নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে সমীর চন্দকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতিকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে তাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। 

শ্রমিক লীগ : কৃষক লীগের সম্মেলনের পরপরই গত বছরের ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় শ্রমিক লীগের সম্মেলন। এই সংগঠনেও পরিবর্তন আসে শীর্ষ নেতৃত্বে। জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন ফজলুল হক মন্টু এবং সাধারণ সম্পাদক হন কে এম আজম খসরু।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ : সম্মেলনের আগে ক্যাসিনোকাণ্ডসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে সব কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের আগের কমিটির দুই শীর্ষ নেতাকে। সংগঠনকে বিতর্কমুক্ত রেখে সাংগঠনিক কাজে গতি ফেরাতে ১৬ নভেম্বর জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব উপহার দেন শেখ হাসিনা। এতে সভাপতির দায়িত্ব পান নির্মল রঞ্জন গুহ। আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান আফজালুর রহমান বাবু।

যুবলীগ : যুবলীগের সাবেক কমিটির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কিছু নেতা ক্যাসিনোকাণ্ডসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় সংগঠনের দায়িত্বশীল পদ থেকে অব্যাহতি পান। ফলে মাঠের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন যুবলীগের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে গত বছরের ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় সংগঠনটির ৭ম জাতীয় কংগ্রেস। এর মধ্য দিয়ে সংগঠনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ। আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান মাইনুল হোসেন খান নিখিল।

এদিকে গত সপ্তাহে ঘোষণা করা হয়েছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর আওয়ামী লীগের কমিটি। এখানেও নেতৃত্বের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আর আগামী দু-এক দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।