কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নিখোঁজ নেতাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন বিএনপি। এর মধ্যে সর্বশেষ ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনের দিন রাজধানীর একাধিক স্থানে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে প্রথমে ৯ জন নেতাকর্র্মী নিখোঁজ হন। বিএনপির অভিযোগ, রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে সাদাপোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের তুলে নিয়ে গেছেন। তবে ওই ৯ জনের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত পাঁচজনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো চারজন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের দুজনকে হাইকোর্ট এলাকা থেকে পুলিশ তুলে নিয়েছে বলে দাবি বিএনপির।
এদিকে নিখোঁজ নেতাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। নিখোঁজদের পরিবারের বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির নেতারা বলেন, নিখোঁজ নেতাকর্মীদের পরিবার হয়রানির ভয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছেন। তারা নিজেরা খোঁজ নিয়ে পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৮ নভেম্বর সরকারের করা বাসে অগ্নিসংযোগের মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বের হওয়ার সময় তুরাগ থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মামুন পারভেজ তন্ময় এবং তার সঙ্গে থাকা তুরাগ থানা যুবদলের সহসভাপতি তৌহিদুল ইসলাম হাসিবকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। গত বুধবার সন্ধ্যায় উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টর থেকে উত্তরা পশ্চিম থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস মজুমদার মাসুমকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদাপোশাকধারীরা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে সংশ্লিষ্ট থানাসহ ঢাকার বিভিন্ন থানা ও সংস্থার দপ্তরে খোঁজ নেওয়া হলে তাদের আটকের বিষয়টি অস্বীকার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।’
তিনি আরও বলেন, গতকাল পর্যন্ত তন্ময়, হাসিব, মাসুম ও তার এক সহযোগীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের পরিবারের সদস্যরাও হয়রানির স্বীকার হচ্ছে। গত শুক্রবার রাতে যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ও ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপির প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীরের উত্তরার বাসায় অভিযান চালিয়েছে সাদাপোশাকের সদস্যরা।
এদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ঢাকা-১৮ আসনে উপনির্বাচনের দিন রাজধানীতে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় বিএনপির তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন পল্টন থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী রেজাউল হক বাবু ওরফে জিম বাবু (২৮), পল্টন থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক লিয়ন হক (৩০) ও যুবদলকর্মী মো. আজাদ (২৮)। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পল্টনে গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় শনাক্ত করে গতকাল শনিবার ভোরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিম বাবু গাড়িতে পেট্রোল ঢেলে দেয় এবং আরেকজন আগুন দেয়। এখানে ইমতিয়াজ নামে আরেকজন যুবদলকর্মী ছিল, তাকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে গতকাল শনিবার বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে কী তথ্য আছে তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হোক। আসলে সরকার নিজেরাই এসব ঘটনা ঘটিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ও নির্যাতন করে মিথ্যা বক্তব্য তুলে ধরছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে লিয়ন হকের পরিবারের বরাত দিয়ে প্রিন্স বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছে, গতকাল ভোরে লিয়নসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ ১৭ নভেম্বর যুবদল নেতা লিয়ন হককে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় সাদাপোশাকের পুলিশ।
তিনি আরও বলেন, এর আগে আরও কয়েকজনকে সাদাপোশাকের পুলিশ আটক করলেও অস্বীকার করেছিল। পরে যে চারজনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে তারা হলেন মোস্তাফিজুর রহমান, মিজানুর রহমান মিজান, রবিউল ইসলাম ও আবুল হাসনাত অনু। এখনো যারা নিখোঁজ আছেন তারা হলেন যুবদল তুরাগ থানার সাধারণ সম্পাদক মামুন পারভেজ তন্ময়, সহসভাপতি তৌহিদুল ইসলাম হাসিব, যুবদল উত্তরা পশ্চিম থানার সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস মজুমদার মাসুম ও সদস্য সেলিম মিয়া।
গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংবাদ সম্মেলন করে ১২ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিএনপিকে জড়িয়ে যে বক্তব্য দিয়েছে, বিএনপি সেই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ন্যক্কারজনক ঘটনার পর থেকেই বিএনপি বলে আসছে, এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপি কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। বিএনপি জ্বালাও-পোড়াওসহ অগ্নিসংযোগের মতো ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। অতীতের মতোই এর দায় বিএনপির ওপর জবরদস্তিমূলকভাব চাপিয়ে দিতে চায় সরকার। সরকারের এ ধরনের অপকৌশলে বিএনপি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এটি সরকারের সাজানো নাটকের পুনরাবৃত্তি মাত্র।
এতে রাজনীতি ও গণতন্ত্রের বৃহত্তর স্বার্থে সরকারকে আবারও এ ধরনের অপতৎপরতা বন্ধ করার এবং সরকারের অপপ্রচার ও মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত না হতে জনগণের প্রতি বিএনপির পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়।
বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উত্তরার বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের বাসায় বাসায় হানা দিচ্ছে। গত শুক্রবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি এবং ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপির প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের বাসায় অভিযান চালিয়েছে। নেতাকর্মীদের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করা হচ্ছে। ভয়ে নেতাকর্মীরা তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছে। নিখোঁজ হওয়া নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা খুব অসহায় বোধ করছেন।’