সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ব্যাপক মুনাফায় রয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড। এছাড়া মন্দঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণে ছাড়ের কারণে করোনাকালীন ইস্টার্ন ব্যাংক নিট মুনাফায় উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংকটির নিট মুনাফা বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। যদিও এ সময় ব্যাংকের আয়ের প্রধান উৎস সুদ আয় কমেছে। গতকাল প্রকাশিত ব্যাংকটির অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।
চলতি বছর ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনায় ব্যাংকগুলোর সুদ আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এছাড়া করোনাকালীন বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে গেছে। এ সময়ে উৎপাদনশীল খাতে বিক্রি কমে গেছে। সুদের হার কমে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এসএমই খাতেও ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ প্রায় বন্ধ রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বল্প ব্যয়ের সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট মুনাফার অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ইস্টার্ন ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৯২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে সরকারি সিকিউরিটিজের এই বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২০৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। মাত্র নয় মাসে সরকারি সিকিউরিটিজে ইস্টার্ন ব্যাংকের বিনিয়োগ বেড়েছে ৬৩ শতাংশ। অথচ এ সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ উল্টো কমেছে। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর বেসরকারি খাতে বিতরন করা ঋণের স্থিতি ছিল ২১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরে ২১ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকায় নেমেছে।
ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নেমে আসা ও বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়ায় চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে ইস্টার্ন ব্যাংকের সুদ বাবদ আয়ও কমেছে। এ সময় ইস্টার্ন ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে সুদ বাবদ আয় হয়েছে ৪৭৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ৪ শতাংশ কম। ঋণের সুদ হার কমে যাওয়ায় আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয়ের পরিমাণও কমেছে। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে আমানত ও ধারের বিপরীতে সুদ ব্যয় হয়েছে ৩২৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৮০ কোটি টাকা। এর ফলে চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে সুদ বাবদ নিট আয় হয়েছে ১৫১ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ কম।
তবে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়ায় এ খাত থেকে ইস্টার্ন ব্যাংকের আয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকটির আয় হয়েছে ১২৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে শতভাগ বেশি। এ সময়ে কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ আয়ও বেড়েছে। ফলে চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে সুদবহির্ভূত আয় হয়েছে ২১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪৬ কোটি টাকা।
চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে সুদ আয় কমে যাওয়ার পরও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়ায় ইস্টার্ন ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৩৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ কোটি টাকা বেশি। করোনার সময়ে ব্যাংক ঋণ বিতরণ কমিয়ে দিলেও পরিচালন ব্যয়ে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। এ সময়ে ভাড়া, বিভিন্ন পরিষেবার ব্যয় ও বিজ্ঞাপন বাবদ ব্যয় কমলেও বেতন-ভাতা ও অবচয় বাবদ খরচ বেড়েছে। ফলে পরিচালন ব্যয় চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে প্রায় ৮ কোটি টাকা বেড়েছে।
করোনায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করলেও কোনো গ্রাহকের ঋণমানের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোকেও মন্দ ঋণের সঞ্চিতি সংরক্ষণে বড় ছাড় দেওয়া হয়। এসব সুবিধার কারণে চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে সঞ্চিতি বাবদ কোনো অর্থ রাখতে হয়নি ইস্টার্ন ব্যাংককে, উল্টো আগের সঞ্চিতি সংরক্ষণ থেকে কিছু অর্থ মুনাফায় ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। এ সময়ে অন্যান্য সঞ্চিতি খাত থেকে ৪২ কোটি ৫০ লাখ টাকা মুনাফায় ফেরত এনেছে ব্যাংকটি, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ওই খাতে ৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা সঞ্চিতি হিসেবে রেখেছিল ইস্টার্ন ব্যাংক। ফলে সাধারণ ও নির্দিষ্ট সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরও চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে মোট সঞ্চিতি থেকে ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা মুনাফায় যোগ করতে পেরেছে ব্যাংকটি, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে মোট সঞ্চিতি বাবদ ৫৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা রাখতে হয়েছিল।
সঞ্চিতি সংরক্ষণের আগে ব্যাংকটির মুনাফা চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে দাঁড়ায় ২০৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর আগের রাখা সঞ্চিতি থেকে অর্থ ফেরতের পর ইস্টার্ন ব্যাংকের করপূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়ায় ২০৭ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। কর পরিশোধের পর চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে ইস্টার্ন বাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৩৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফায় নির্ভর করে চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে (জানুয়ারি- সেপ্টেম্বর) উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক। তবে এই মুনাফা এসেছে সরকারি সিকিউরিটিজে করা বিনিয়োগ থেকে। চলতি বছরের নয় মাসে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ৩৭৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৭৬ কোটি টাকা। যদিও এ সময়ে ব্যাংক নিট সুদ আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ কমেছে। চলতি নয় মাসে সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরিমাণ কমেছে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ। কর পরিশোধের পর এ সময় নিট মুনাফা হয়েছে ২৯৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।