শীতে করোনা পরিস্থিতি যাচ্ছে খারাপের দিকে

দেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে করোনা পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে। পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বেড়ে গেছে মৃত্যুর সংখ্যাও। একজন থেকে কতজনে ছড়াচ্ছে, সেই সংক্রমণ হার আর-নট ((রিপ্রডাকশন রেট) আবারও বেড়ে ১-এর ওপরে উঠে গেছে। অর্থাৎ কমিউনিটিতে এখন একজন থেকে অনেকজনে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রবিবারও ৩৮ জন করোনায় মারা গেছেন। পাঁচ দিন আগে ১৭ নভেম্বর মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩৯ জন। সেদিন ৫৭ দিন পর সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ছিল। মার্চে সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর এ পর্যন্ত দেশে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬৪ জন। গত ছয় দিনের মধ্যে চার দিন মৃত্যুর সংখ্যা ২০-৩০ জনের মধ্যে ছিল। অথচ এর আগের সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যা গড়ে ১৫ জনের মতো ছিল।

গত তিন দিন ধরে পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্ত হারও বাড়ছে। গতকাল শনাক্তের হার ছিল ১৪ দশমিক ৮৫, প্রায় ১৫ শতাংশ, যা গত ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ গত চার দিন ধরেই শনাক্তের হার বাড়ছে। গত বুধবার শনাক্তের হার ছিল ১২ দশমিক ৮২ শতাংশ, বৃহস্পতিবার ১৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ, শুক্রবার ১৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ ও শনিবার ১৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অথচ এর আগে শনাক্তের হার ১০-১২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছিল।

আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। গত সাত দিনের মধ্যে ছয় দিনেই দুই হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর আগে ৭০ দিন পর গত ১৬ নভেম্বর প্রথম দুই হাজার রোগী শনাক্ত হয়। এর আগের ৭০ দিন রোগী শনাক্তের সংখ্যা দুই হাজারের নিচে ছিল।

আক্রান্ত বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। চলতি মাসের ১ তারিখে দেশের বিভিন্ন কভিড হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল ২ হাজার ৩০৯ জন। গতকাল ৫৩৮ জন বেড়ে সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৪৭ জনে।

এমন পরিস্থিতিতে কিছুটা উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সংক্রমণ বাড়তির দিকে। তবে এর জন্য শীতের তাপমাত্রা যত না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে শৈথিল্য। বিশেষ করে মাস্ক ব্যবহার একেবারেই কমে গেছে। তবে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অবশ্য করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনই শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বলতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত সপ্তাহের চেয়ে একটু বাড়তির দিকে। তবে এখনো বলা যাবে না যে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ সপ্তাহে যদি বাড়তে থাকে, তৃতীয় সপ্তাহে আরও বাড়ে এবং তখন যদি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তখন বলা যাবে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। যদি আগামী সপ্তাহে কমে যায়, তখন পরিস্থিতিকে আপডাউন বলতে হবে।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার ১০ ছিল সর্বনিম্ন। ১০-১২ শতাংশ থেকে বাড়তে বাড়তে এখন ১৪ শতাংশের বেশি হচ্ছে। এটা যদি দুই সপ্তাহের মধ্যে ১৫ শতাংশে পৌঁছে এবং দুই সপ্তাহ অব্যাহত থাকে, তাহলে দ্বিতীয় ঢেউ বলা যেতে পারে। আজ ১৪ শতাংশের বেশি, আগামীকাল ও পরশু দেখতে হবে কী দাঁড়ায়। তবে শীতে যে বাড়ার আশঙ্কা, সেটা এখনো বলা যাবে না।

শীতকে সামনে রেখে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে কঠোর হতে বলছেন। পাশাপাশি এলাকাভেদে নতুন করে কিছু বিধিনিষেধ আরোপের কথাও বলছেন। তাদের মতে, সব জায়গায় পরিস্থিতি একই রকম নয়। তাই এলাকাভেদে সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক ধরনের সতর্কতা জারি করতেই হবে। শীতে বাড়বে কি না, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে শীতে সতর্ক থাকতেই হবে। যারা শীতকালীন রোগে আক্রান্ত, তারা যদি করোনায় আক্রান্ত হন, তাহলে করোনা জটিল আকার ধারণ করবে। এখন হয়তো শুরুর মতো (মার্চ) সবকিছু বন্ধ করা যাবে না, কারণ প্রান্তিক মানুষের কথা চিন্তা করতে হবে। কাজকর্ম বন্ধ করলে তখন আরেক ধরনের সংকট তৈরি হবে। তবে আমাদের কোথাও কোথাও বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে, কোথাও কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে আরও বেশি কঠোরতা আরোপ করতে হবে। কোথাও কোথাও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করতে হবে। কোথাও কোথাও নিজেদেরই মাস্ক সরবরাহ করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের একার উদ্যোগ নিলে হবে না।

সংক্রমণ বাড়ছে উল্লেখ করে ডা. আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, তুলনামূলকভাবে সংক্রমণ বাড়ছে। বিশেষ করে যারা এতদিন অনেক সাবধানে ছিল, তারাও বাসা থেকে বের হতে শুরু করেছে। তুলনামূলকভাবে একটা বড় অংশ মানুষ লক্ষণ ছাড়া, তারাও ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেহেতু মাস্কের ব্যবহার কমে যাচ্ছে, ফলে তারাও ছড়াচ্ছে। এর ফলে যে অংশ একটু অসাবধান হচ্ছে, তারাই সংক্রমিত হয়ে যাচ্ছে।

এ বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে বলেন, যেহেতু এখন তুলনামূলক হারে বাড়ছে, সেহেতু স্বাস্থ্যবিধি আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা উচিত। সরকার তার জায়গায় থেকে ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ শুরু করেছে, ক্যাম্পেইন করছে, জরিমানা করছে। কিন্তু সবার ওপর দরকার ব্যক্তিগত সচেতনতা। সামাজিক সংগঠনগুলোও এ সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে পারে। যেমন পাড়ায় পাড়ায় মাস্ক সরবরাহ শুরু হতে পারে। একটি সংগঠন শুরু করলে অন্য সংগঠনগুলোও শুরু করবে। তাহলে মানুষের মাঝেও এক ধরনের সতর্কতা তৈরি হবে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা ছাড়া শুধু সরকার বা আইন প্রয়োগ করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সারা পৃথিবীতেই এখন এভাবেই নিয়ন্ত্রণে কাজ করা হচ্ছে।

বর্তমানে সংক্রমণ বাড়ার কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বাড়ার একটা কারণ স্বাস্থ্যবিধি ব্যাপকহারে পালন করছে না মানুষ। দ্বিতীয়ত শীত আসলে বাড়বে এরকম একটা কথা বলা হচ্ছে সারা পৃথিবীতেই। শীতকালীন রোগগুলোও শুরু হচ্ছে। সাধারণ কোল্ড বা ব্রঙ্কোলাইটিস, অ্যাজমা তারা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে। এক ধরনের মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে শীতকালে ভোগেই। তারা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। তবে বাড়ুক আর কমুক, সবচেয়ে বড় বিষয় সচেতন থাকতে হবে। সচেনতনতায় শৈথিল্য আসবে, লোকজন আক্রান্ত হবে। একজন মাস্ক পরে অন্যজনকে প্রটেকশন দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই অন্যজন যদি না পরে তাহলে প্রথমজন তো প্রটেকশন পাচ্ছে না।

মাস্ক সবাইকেই পরতে হবে উল্লেখ করে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, বলা হচ্ছে যদি ৯৫ শতাংশ মানুষ মাস্ক পরে, তাহলে সংক্রমণ যেমন কমে, মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে নেমে আসবে। অথচ এখন দেশে ২০-২৫ শতাংশ মানুষ মাস্ক পরছে। এটাকে ৯০ শতাংশে না নিলে সংক্রমণ কমানো যাবে না। সরকার টেলিভিশনে প্রচার করছে। জেলাপর্যায়ে জরিমানা হচ্ছে। হাসপাতালগুলো মাস্ক না পরলে সার্ভিস দিচ্ছে না। কিন্তু কেউ যদি হাসপাতালে যাওয়ার সময় মাস্ক পরে ও সেখান থেকে বেরিয়ে মাস্ক খুলে ফেলে, তাহলে হবে না। সবসময় মাস্ক পরে থাকতে হবে যতক্ষণ বাইরে থাকবে।

শীতে করোনা বাড়ার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেটার প্রভাব কি পড়তে শুরু করেছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. এএসএম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের এখানে শীতের তাপমাত্রায় যত না প্রভাব ফেলবে, তার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে সামাজিকভাবে মেলামেশায়। বিশেষ করে ইনডোর পার্টিতে (ঘরোয়া অনুষ্ঠান) বেশি প্রভাব ফেলবে। সবাই একসঙ্গে মাস্ক খুলে খেতে বসবে। অনেকে সাজগোছ করার জন্য মাস্ক পরেই যায় না। শীতকালের বিয়েতে কেউ মাস্ক পরে যায় না। কিন্তু শীতকালে বড় কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান করাই যাবে না। আমেরিকায় হাউজ পার্টিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি এমনও বলা হচ্ছে, যে হোস্টেলে থাকে সে যদি বাসায় আসে, তাহলে বাসায়ও নিরাপত্তা থাকবে না। যে যেখানে আছে, সেখানেই থাকতে বলা হচ্ছে ছুটির সময়। আপনি যদি আজ পরীক্ষা করে দেখেন নেগেটিভ ও বাসায় গেলেন সেখানেও ভয় আছে। কারণ আক্রান্ত হওয়ার সময় সংক্রমিত হওয়ার দিন থেকে ১৪ দিনের মধ্যে। সুতরাং এ সময়ের মধ্যে সে যেকোনো দিন আক্রান্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এমনও বলা হচ্ছে, বাবা-মার সঙ্গেও দেখা করা যাবে না। সিডিসিও বলছে, ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার দরকার নেই। হাউজ পার্টি ও রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।