তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিপূরণ বঞ্চিত আহত শ্রমিকদের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি শ্রম মন্ত্রণালয়। গত অক্টোবরে প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর তাদের ক্ষতিপূরণ বিষয়ে ইতিবাচক তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ পরিস্থিতিতে দেশের গার্মেন্ট মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ এবং তাজরীন ফ্যাশনের মালিকপক্ষকে চিঠি দিয়েছে অধিদপ্তর। চিঠিতে আট বছর আগে অগ্নিকাণ্ডের পরপর শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ হিসেবে কী পরিমাণ টাকা পেয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের পরপরই শ্রমিকদের এক দফা টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান।
এদিকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন ক্ষতিপূরণ বঞ্চিত তাজরীন শ্রমিকরা। কর্মসূচির ৬৬তম দিনে গতকাল রবিবার দুপুরে শ্রম মন্ত্রণালয় অভিমুখে ‘জবাব চাই’ মিছিল করেন তারা। শ্রমিকদের ভাষ্য, গত ২৪ সেপ্টেম্বর ও ১৫ নভেম্বর দুই দফায় মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার পরও কোনো জবাব না পাওয়ায় এ মিছিলটি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সচিবালয়ের সামনে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে মিছিলে বাধা হয়। এ সময় তারা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন। পরে ব্যারিকেডের সামনেই আন্দোলনকারীরা সমাবেশ করেন এবং জরিনা বেগমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি শ্রমিক প্রতিনিধিদলকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ফিরে দলনেত্রী জরিনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ ৬৬ দিন ধরে আমরা প্রেস ক্লাবের সামনে বসে আছি। আমরা শ্রমিক, আমরাই দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরাই। আমরা এখানে কোনো দয়া বা ভিক্ষা চাইতে আসিনি। আমরা আমাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ চাইতে এসেছি। অগ্নিকাণ্ডে আহত হওয়ার পর থেকে আমরা আর কাজ করতে পারছি না, খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। আমাদের আর পিছু হটার কোনো রাস্তা নেই।’
পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে এই শ্রমিকনেত্রী বলেন, ‘আগামীকাল আমরা গণভবন অভিমুখে কাফনের কাপড় পরে ‘জিন্দা লাশ’ মিছিল করব। আমরা আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত। সেদিন হয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবি মেনে নেবেন না হয় শ্রমিকরা দেশ অচল করে দেবে।’
দেশের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণবিষয়ক তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর। তাজরীনের শ্রমিকদের নিয়ে তাদের জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাজরীনের শ্রমিকদের অগ্নিকাণ্ডের পরপরই এক দফা টাকা দেওয়া হয়েছে। সরকারের শ্রমিক কল্যাণ তহবিল, বিভিন্ন সংস্থা এবং গার্মেন্টের মালিকপক্ষ এ টাকা দেয়। এখন কেন শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন তা বুঝতে পারছি না। মন্ত্রণালয়ের অফিসাররা বিষয়টা খোঁজ নিয়ে দেখছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ পাননি এমন কেউ থাকার কথা না। ইনকোয়ারি চলছে। প্রেস ক্লাবে যারা আন্দোলন করছেন তাদের মধ্যে অনেকেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে আগে টাকা পেয়েছেন। এরপরও আমরা দেখছি বঞ্চিত কেউ আছেন কি না।’
কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের উপমহাপরিচালক এ কে এম সালাউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকরা আট বছর আগে অগ্নিকাণ্ডের পরপর কী ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন তা জানতে মন্ত্রণালয় আমাদের নির্দেশনা দিয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা তাজরীনের মালিকপক্ষ এবং বিজিএমইএকে চিঠি দিয়েছি। চিঠিগুলোর উত্তর আসার পর খুব অল্প সময়ে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করছি একটা ইতিবাচক প্রতিবেদন আমরা দিতে পারব। যদি দেখা যায় শ্রমিকরা আগে কিছু পেয়েছেন তাহলেও হয়তো আবার কিছু টাকা তারা পেতে পারেন। আর যদি না পেয়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই মন্ত্রণালয় বিষয়টা বিবেচনা করে ক্ষতিপূরণ দেবে। শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকেও কিছু টাকা দেওয়ার সুযোগ আছে।’
অগ্নিকাণ্ডের পরপর শ্রমিকরা কত টাকা কীভাবে পেয়েছেন তা জানাতে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হককে চিঠি দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সালাউদ্দিন বলেন, ‘তখন বিভিন্ন এনজিও টাকা দিয়েছে, মালিকপক্ষ কিছু সহযোগিতা করেছে এবং অন্যান্য বিভিন্ন সংস্থাও টাকা দিয়েছে। তবে এসব সাহায্য কোনো অরগানাইজড পদ্ধতিতে করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর অরগানাইজড উপায়ে সাহায্য করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল করা হয়। তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের সময় এটা ছিল না।’
পরিকল্পিত সাহায্য পদ্ধতি না থাকলেও কোনো শ্রমিক টাকা থেকে বঞ্চিত হননি বলেও দাবি করেন অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের উপমহাপরিচালক। তিনি বলেন, ‘যারা আন্দোলন করছেন তাদের মধ্যে বড় অংকের টাকা পেয়েছেন এমন শ্রমিকও আছেন। দেড় লাখ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৯ লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন এমন শ্রমিকও আন্দোলনে বসেছেন। পাঁচ লাখ বা ছয় লাখ টাকা পেয়েছেন এমনও আছে।’
‘জবাব চাই’ মিছিলে আহত শ্রমিকের সন্তানদের অংশগ্রহণ : গতকালের মিছিল ও সমাবেশে শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের শিশুসন্তানরাও ফেস্টুন হাতে উপস্থিত ছিল। এমন তিন শিশু গাজী, নাসিম ও সাবিনার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা গত ১৫ দিন ধরে প্রেস ক্লাবের সামনে মা বা বাবার সঙ্গে অবস্থান করছে। গতকাল ১০-১৩ বছর বয়সী এই শিশুরা মিছিলের সামনের সারিতে হেঁটে সচিবালয় পর্যন্ত যায়। শ্রমিকদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারাও স্লোগান দেয়, ‘মরব তবু ফিরব না, দাবি আদায় করবই’।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে সচিবালয়ের সামনের সমাবেশে জরিনা বেগম বলেন, ‘আমাদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে প্রেস ক্লাবের সামনে বসে আছি অথচ কেউ কোনো খোঁজই নিচ্ছে না। তাজরীনের মালিক দেলোয়ার আগুন লাগিয়ে ১২৫ শ্রমিক হত্যা করেও গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেলোয়ারের কোনো বিচার কেন করা হচ্ছে না জবাব চাই?’
গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি শবনম হাফিজ বলেন, ‘আগামীকাল সকালে আমরা জুরাইন কবরস্থানে তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের কবর জিয়ারত করতে যাব। জিয়ারত শেষে কাফনের কাপড় পরে গণভবনের দিকে মিছিল নিয়ে যাব। শ্রমিকদের আর পিছু হটার পথ নেই। প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবি পূরণ করার আগ পর্যন্ত আমরা ফিরব না।’
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের সমন্বয়ক শামীম ইমাম, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম সবুজ, টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ইকবাল কবির, শ্রমিকনেত্রী আমেনা বেগম প্রমুখ।