তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিপূরণবঞ্চিত আহত শ্রমিকদের গণভবনমুখী মিছিল পুলিশের বাধায় পণ্ড হয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কাফনের কাপড় পরে ‘জিন্দা লাশ’ মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে গণভবনের দিকে রওনা দিলে পুলিশ হাইকোর্টের মোড়েই তা আটকে দেয়। এ সময় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গণভবনে যেতে চাইলে পুলিশ ‘সম্মতি দিয়ে’ তাদের সিএনজিতে তুলে দেয়। বাকিরা ব্যারিকেডের সামনেই অবস্থান নিয়ে সেখানে সমাবেশ করেন।
অভিযোগ উঠেছে, রওনার পর প্রতিনিধিদলের সদস্যদের গণভবনের বদলে জোর করে বিজয় সরণি নামিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিনিধিদলটির সদস্যরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইচ্ছে করেই কর্মসূচি ভেস্তে দিতে এ নাটক সাজিয়েছে। তারা এ ঘটনাকে প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন। এ বিষয়ে কথা বলতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেনের মোবাইল ফোনে কল ও প্রশ্ন লিখে এসএমএস পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ক্ষতিপূরণ, সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দাবিতে আট বছর আগের তাজরীন অগ্নিকান্ডে আহত শ্রমিকরা প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের ভাষ্য, ৬৮ দিন কর্মসূচি পালনের পরও এসব দাবিকে আমলে নেওয়া হয়নি।
শ্রমিকরা জানান, কর্মসূচি শুরুর পর গত ২৪ সেপ্টেম্বর ও ১৫ নভেম্বর দুই দফায় তারা প্রধানমন্ত্রী, শ্রম মন্ত্রণালয় ও বিজিএমইএ বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষই দাবি পূরণে সক্রিয় হয়নি। তাই গতকাল তারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে গণভবন অভিমুখে মিছিলের কর্মসূচি ডাকেন।
‘প্রতারণার’র শিকার প্রতিনিধিদলের এক সদস্য গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি শবনম হাফিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আজ (গতকাল) যে প্রতারণাটা করল তা কল্পনার বাইরে। হাইকোর্টের সামনে ব্যারিকেডে আটকানোর পর আমরা গণভবন যেতে চাইলাম। পুলিশ রাজি হয়। তখন একটা সিএনজিতে করে পাঁচ সদস্যের দল রওনা হই।’
রওনা হওয়ার পর থেকে প্রতিনিধিদের ওপর নজরদারি করার অভিযোগ তুলে শবনম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলা শুরু করার পর থেকেই “গণভবনওয়ালা”রা মোবাইলে বারবার আমাদের খোঁজ নিচ্ছিল, জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিল আমরা কতদূর এগিয়েছি। একপর্যায়ে বিজয় সরণির মোড়ে আমাদের সিএনজি থামানো হয়। আমাদের বলা হয়, সিএনজির আর দরকার নেই, আপনারা পুলিশের গাড়িতে করে বাকিটা যাবেন।’
গাড়ির কথা বলা হলেও প্রতিনিধিদের গাড়িতে তোলা হয়নি জানিয়ে এ শ্রমিকনেত্রী বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে টালবাহানা শুরু করা হয়। নানারকম যুক্তি দেখিয়ে আমাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করা হয়। এ সময় আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন আবু বকর, সিদ্দিকুর ও আকবর নামে তিন পুলিশ অফিসার। একপর্যায়ে তারা সরাসরি বলেন যে আমাদের গণভবনে যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের দাবি লেখা কাগজ যা আছে তা যেন ওনাদের দিয়ে দিই।’
প্রতিনিধিদলের আরেক সদস্য জরিনা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ভাবতেও পারিনি পুলিশ এমন করবে। বিজয় সরণিতে থামানোর পর তারা বলেছিল, চাইলে আমি একা গণভবনে যেতে পারি। আমি রাজি হইনি। পরে যখন আমাদের কাগজ চাইল তখন বললাম, প্রধানমন্ত্রী যে সিল ব্যবহার করেন সেটা দিয়ে রিসিভ কপি দেন।’
এরপর উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা শ্রমিক প্রতিনিধিদের কাছ থেকে স্মারকলিপি নিয়ে নেন এবং কিছুক্ষণ পর একটি রিসিভ কপি তাদের ফেরত দেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানান শবনম। তিনি ও জরিনা ছাড়া প্রতিনিধিদলের অন্য তিন সদস্য ছিলেন শ্রমিক সুলাইমান, নাসিমা বেগম এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম সবুজ।
পরবর্তী কর্মসূচি প্রসঙ্গে জরিনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের তো আর পিছু হটার রাস্তা নেই। আমরা আপাতত প্রেস ক্লাবের সামনে চলমান অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাব। আগামী আট-দশ দিন আমরা সরকারের কাছ থেকে দাবির বিষয়ে উত্তরের অপেক্ষায় থাকব। দাবি পূরণ না করে আমরা ফিরব না। সরকার উত্তর না দিলে কী করা হবে তা পরে জানানো হবে।’
এ ঘটনার আগে শ্রমিকদের মিছিল হাইকোর্টের কদম ফোয়ারার সামনে পুলিশি ব্যারিকেডে বাধা পায়। এ সময় শ্রমিকরা ব্যারিকেডের একপ্রান্ত ভেঙে এগিয়ে যান, পুলিশের সঙ্গে মৃদু ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। এরপর শ্রমিকরা রাস্তায় শুয়ে পড়ে নানান রকম স্লোগান দেন এবং সমাবেশ করেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, তাজরীনের পুড়ে যাওয়া ভবনের জমিতে নিহত শ্রমিকদের পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন করা হোক। এতদিন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলেছে, শ্রমিকদের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সরকার বাধা না দিলে শ্রমিকরা এভাবেই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ইকবাল কবীর, ও এস কে গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন, বাংলাদেশের সোয়েটার গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এএএম ফয়েজ হোসেন, সমাজকর্মী মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ রেডিমেড পোশাক প্রস্তুতকারী সংঘের নেতা মাহাবুব আলম, গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার, গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের মানিক হোসেন, বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা জাকি সুমন প্রমুখ।
গতকাল সকালে ১১টি গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের জোট ‘গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলন’ রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে। এরপর শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এর আগে অধিকার আন্দোলনের সমন্বয়ক শামীম ইমামের সভাপতিত্বে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু; বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, ওএসকে গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. ইয়াসিন, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় নেতা মুসা কলিমউল্লাহ, গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেতা মানিক হোসেন প্রমুখ।
এদিকে গতকাল সকালে নিহত শ্রমিকদের স্বজন ও আহতসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাভারের নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন গার্মেন্ট ভবনের প্রধান ফটকের সামনে ফুল দিয়ে নিহত শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতদের স্বজনরা। পরে তাজরীন ট্র্যাজেডিসহ সব শ্রমিক হত্যাকান্ডের বিচার, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে সমাবেশ হয়।
সমাবেশে বাংলাদেশ শ্রমিক সংহতি ফেডারেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অরবিন্দু বেপারী বলেন, কারখানায় আগুন লাগার পরও মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ছুটি না দিয়ে উল্টো সব গেট বন্ধ করে দেয়। সেখানে আটকা পড়ে ১১৩ জন শ্রমিক আগুনে পুড়ে মারা যান। আহত হন অর্ধশত। তবে দুঃখের বিষয় আট বছরেও শাস্তি নিশ্চিত হয়নি দোষীদের।
অগ্নিকাণ্ডে আহত শ্রমিক হালিমা বেগম বলেন, ‘দিনটির কথা সবাই ভুলে গেলেও আমরা ভুলতে পারব না। আমরা তাজরীনের শ্রমিকরা সব দিক থেকেই বঞ্চিত। দুর্ঘটনার সময় প্রিয়জন, স্বজন, সহকর্মী ও হাত-পা হারিয়ে আট বছর ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছি। যা পেয়েছি সেটা আর্থিক সহায়তা, এটি ক্ষতিপূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।’
গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, ‘আজ পর্যন্ত যতগুলো পোশাক কারখানায় দুর্ঘটনার নামে শ্রমিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে তার কোনোটিতেই পর্যন্ত বিচার সম্পন্ন হয়নি। যতদিন পর্যন্ত ন্যায়বিচার সম্পন্ন না হবে, দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা না হবে, শ্রমিকের পক্ষে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হবে ততদিন বলা যাবে না এ শিল্পের অগ্রগতি হয়েছে।’ (প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন দেশ রূপান্তরের সাভার প্রতিনিধি)