ড. সাদেকা হালিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি থেকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপসহ এমএ ও পিএইচডি করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য কমিশনে তথ্য কমিশনার পদে ডেপুটেশনে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ড. সাদেকা জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির (২০০৯) ১৮ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ও ‘চ’ ইউনিট বাতিলসংক্রান্ত বিতর্ক, বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগসহ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার নানা দিক নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের অনিন্দ্য আরিফ
দেশ রূপান্তর : চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট ছাড়া বাকি ৩৯টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে আপনার অভিমত কী?
সাদেকা হালিম : বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা ক্লাস নিতে পারছি, কিন্তু পরীক্ষা নেওয়া যাচ্ছে না। এরকম পরিস্থিতিতে ইউজিসি এবং শিক্ষামন্ত্রী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সামনে গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাবনা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বলেছে যে তারা গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে আগ্রহী নয়। ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে স্থানীয় কলেজগুলো এবং বিদ্যালয়গুলোতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এখন সারা বিশ্বে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে এবং বাংলাদেশেও দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গুচ্ছ পদ্ধতির পরীক্ষা নেওয়ার জন্য একটি তারিখ নির্ধারণ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও ধরা হচ্ছে, ডিসেম্বরের শেষে কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারির প্রথমে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। আমরা জানি, ডিসেম্বরে এবারের উচ্চ মাধ্যমিকে ‘অটোপাসের ফল তৈরি করা’ হবে। এবার যেহেতু সবাই অটোপাস করেছে, তাই প্রচুর শিক্ষার্থী এবার উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় থেকে আসবে। বলা হয়েছে, এসব শিক্ষার্থীর মাধ্যমিকের ফল থেকে ৭৫ ভাগ এবং জেএসসির ফল থেকে ২৫ ভাগ গড় করে উচ্চ মাধ্যমিকের ফল নির্ধারণ করা হবে। চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় এবং সম্ভবত বুয়েট বাদে বাকি ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা গুচ্ছ পদ্ধতিতে নেওয়ার কথা উঠছে। এখন এত শিক্ষার্থীর ভর্তি পরীক্ষা গুচ্ছ পদ্ধতিতে নেওয়া আমার কাছে বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ মনে হয়।
দেশ রূপান্তর : আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২১-২২) থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদ বা ‘ঘ-ইউনিট’ ও চারুকলা অনুষদ বা ‘চ-ইউনিট’-এর ভর্তি পরীক্ষা না নেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটি। বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশসংখ্যক শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরাসহ অনেকেই আপত্তি জানিয়ে বলছেন যে, ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষা বাতিল হলে সামাজিকবিজ্ঞানের গুরত্ব উপেক্ষিত হবে এবং বিশেষায়িত ‘চ’ ইউনিটের পরীক্ষা বাতিল হলে দেশে চারুকলার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। ডিনস কমিটির একজন সদস্য হিসেবে আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সাদেকা হালিম : বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অনেকদূর এগিয়েছে। এ সাক্ষাৎকারের আগে গত ২৩ নভেম্বর আমাদের অ্যাডমিশন কমিটির একটি সভা হয়েছে। সেখানে ১০টি এজেন্ডার মধ্যে এ বিষয়টি ছিল। এ প্রস্তাবটি করা হয়েছে ‘২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা সংস্কারে’র আলোকে। এখন সংস্কারের বিষয় তো মাঝেমধ্যেই আলোচনার টেবিলে আসে। আমরা জানি যে ‘ক’ ইউনিট হলো বিজ্ঞান, ‘খ’ ইউনিট হলো কলা, ‘গ’ ইউনিট হলো বাণিজ্য আর ‘ঘ’ ইউনিট হলো মাল্টিডিসিপ্লিনারি। আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুবার ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু খুব সম্ভবত ২০১৫ সাল থেকে এ দুবারের সুযোগ বাতিল করা হয়। তাহলে আগে ভর্তিচ্ছুদের সামনে দুটি ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ এবং ‘ঘ’ ইউনিট ছিল। গত ৮ নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির একটি সভায় এজেন্ডা বহির্ভূতভাবে একটি আলোচনায় ‘ঘ’ ইউনিট এবং ‘চ’ ইউনিট বাতিলের একটি প্রস্তাব করা হয়। গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর প্রচুর আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বওয়া শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বলেন যে এ দুটি ইউনিট আর থাকছে না। এখন ‘চ’ ইউনিটের সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাসহ অনেকেই এই ইউনিট উঠিয়ে দেওয়ার বিষয়টি মানতে পারছেন না। কেননা এটা একটা বিশেষায়িত ইউনিট। ‘ক’ ইউনিটের মাধ্যমে তো আপনি পেইন্টিং, ভাস্কর্য কিংবা চারুকলার অন্য বিশেষায়িত বিভাগের পরীক্ষা নিতে পারেন না। এবার ‘ঘ’ ইউনিটের বিষয়ে আসা যাক। আমরা ৮ নভেম্বরের পর সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের একটি ‘ফ্যাকাল্টি মিটিং’ করেছি। এ মিটিংয়ে সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের সব অধ্যাপক উপস্থিত থাকেন। সেই সভায় ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষা বাতিলের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ১৯৮২ সাল থেকে এই ইউনিটের পরীক্ষা গ্রহণ শুরু হয়। এর আগে বিভাগ অনুযায়ী পরীক্ষা নেওয়া হতো। এখন এই অনুষদে ১৬টি বিভাগ, প্রায় ৩০০ শিক্ষক এবং প্রায় সাত-আট হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এই অনুষদেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান বয়সী দুটি বিভাগ-অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান রয়েছে। এই করোনা মহামারীর সময়ে সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদ ও চারুকলার বিভিন্ন শিক্ষকই তো বেশি কথা বলছেন এবং ভূমিকা রাখছেন। এই ‘ঘ’ ও ‘চ’ ইউনিটের আলাদা ভর্তি পরীক্ষা না নেওয়ার চিন্তা তো অসাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ইত্যাদির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখন বলা হচ্ছে ‘খ’ ইউনিট বা কলা অনুষদের মাধ্যমেই সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদ বা ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষা নেওয়া যায়। কেননা দুটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রায় একইরকম হয়। এখানে খেয়াল রাখা উচিত যে ‘খ’ ইউনিটের মতো ‘ঘ’ ইউনিটের বাংলা, ইংরেজি পরীক্ষা থাকলেও ‘ঘ’ ইউনিটে সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন করা হয় সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে। আর গত বছর আমরা ‘এমসিকিউ’র সঙ্গে লিখিত পরীক্ষারও ব্যবস্থা করেছি। অনেক শিক্ষার্থীই উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান পড়লেও সামাজিকবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। এজন্যই তো প্রতি বছর এই ইউনিটে প্রায় এক লাখের মতো শিক্ষার্থী আবেদন করে এবং প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা দেয়। আর দেখা যায় যে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান পড়া শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোতে সবচেয়ে ভালো ফল করে।
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে ইউজিসি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যদের এবং নানা ধরনের প্রশাসনিক দুর্নীতিকে কীভাবে দেখছেন?
সাদেকা হালিম : বলা হয়, সরকারি চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি করেন। কিন্তু আসলে সব সেক্টরেই দুর্নীতি হচ্ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ খুবই লজ্জাজনক। আমরা সাধারণ শিক্ষকরা এজন্য খুবই লজ্জিত থাকি। বিশ্ববিদ্যালয় তো জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হয়। জনগণের অর্থ নিয়ে নয়-ছয় করার অধিকার তো কারোর নেই। আমি মনে করি, দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের দুর্নীতি তদন্ত এবং তা দমনে ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করা উচিত। এছাড়া ইউজিসিতে অনেক সময় অনেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগকৃত দুর্নীতির ফাইল নড়াচড়া করা হয় না এবং ইউজিসি থেকে তদন্ত দল সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়। এগুলোও কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : করোনা মহামারীর সময়ে অনলাইন ক্লাসের ধারণা সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশেও বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছে। কিন্তু দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে খুব একটা সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। অনলাইন শিক্ষায় এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিছিয়ে পড়াকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সাদেকা হালিম : করোনা সংক্রমণের কারণে আমাদের দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ আছে। এর একটা বড় কারণ হলো বাংলাদেশ খুবই ঘনবসতির দেশ। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং মাদ্রাসাসহ বহুমুখী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে আছে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থীই সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতার মধ্যে দিন অতিক্রম করছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা করছে। ইউজিসির কাজ হলো দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের দ্বারা রেজিস্টার্ড বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করা। দেশে এখন ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ইউজিসি এসব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাজেট বরাদ্দ, সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শুরু করে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য কত পদ থাকবে, সেগুলো সুপারভাইজ করে। করোনার মধ্যেও ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মতো কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছিল। পাবলিক বিশ্ব¦বিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। করোনার কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কর্মকাণ্ড স্থবির ছিল। অবশ্য ইউজিসির নির্দেশনায় গত জুলাই মাস থেকে আমরা অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছি। তার আগেই মার্চ-জুন পর্যন্ত তিন মাসের বেশি সময় বিনা কর্মকাণ্ডে অতিক্রান্ত হয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে গ্রীষ্মকালীন ছুটির একটা বন্ধ ছিল। এখন আমরা যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তারা শিক্ষা কার্যক্রমের যে ঘাটতি করোনার কারণে হয়েছে, তার খুব একটা পূরণ করতে পারেনি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে পারি যে এখানে আমার মতো শিক্ষকরা এখনো করোনার কারণে অসমাপ্ত সেমিস্টার ও কোর্সই পড়াচ্ছি। এখানে অবশ্য ভেরিয়েশন আছে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০টি অনুষদের মধ্যে সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স, বায়ো-সায়েন্স আছে। এগুলোর তো ল্যাবরেটরি ওয়ার্ক আছে। এখন করোনার মধ্যে এসব বিভাগের তত্ত্বীয় বিষয়গুলো কিছুটা পড়ানো গেলেও ল্যাবরেটরি ওয়ার্ক বাকি রয়ে যাচ্ছে। তারপরও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের অসমাপ্ত সেমিস্টার সম্পন্ন করে নতুন সেমিস্টার শুরু করার প্রক্রিয়ায় আছে। আমরা যখন অসমাপ্ত সেমিস্টার সম্পন্ন করে নতুন সেমিস্টার শুরু করার প্রক্রিয়া শুরু করছি, তখন দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের ‘মূল্যায়ন’ করা যায়নি। আর ‘মূল্যায়ন’ না করার কারণে শিক্ষার্থীরা মনে করছে যে মহামারী শেষ হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম যখন শুরু হবে এবং আমাদের মতো শিক্ষকদের শারীরিক উপস্থিতি যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যাবে, তখন আমরা কোর্সগুলো আবার রিভিজিট করব, পরীক্ষা নেওয়া হবে। এজন্য এখন শিক্ষার্থীদের উৎসাহের ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। আর ইউজিসি ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশে চলা দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দিয়ে থাকলেও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু স্তর রয়েছে। যেমন অ্যাকাডেমিক কমিটি রয়েছে, আবার ডিনদের তত্ত্বাবধানে অনুষদগুলো রয়েছে, এরপর অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল রয়েছে। এসব স্তর পার হয়েই তো এসব প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আবার করোনার সময় ইউজিসিও এসব স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে তেমন কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে পারেনি। আমরা শিক্ষকরাও তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারিনি। আমরা অনলাইনের মতো বড় প্ল্যাটফরমকে ব্যবহার করতে পারিনি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটও তেমনভাবে শিক্ষা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেনি।