বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, লিবিয়াসহ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মানব পাচারে জড়িত ৩৮৭ জনের তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এদের মধ্যে লিবিয়ায় মানব পাচারে জড়িত পাঁচজনের বিরুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল) রেড নোটিস জারি করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ইন্টারপোলের নোটিস জারি হওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজন আগে থেকেই লিবিয়ায় অবস্থান করছে। বাকি দুজনের অবস্থান জানা যায়নি। তালিকার পাচারকারীরা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্নজনকে বিশ্বের নানা দেশের (লিবিয়া ছাড়া) নৌপথ, গহীন জঙ্গল ও মরুপথে নিয়ে যায়। দেশেই এরা সর্বস্ব হারান। আর বিদেশি নিয়ে যাওয়ার পর তাদের নির্যাতন এমনকি হত্যা পর্যন্ত করে পাচারকারীরা।
এ বিষয়ে ইন্টারপোল বাংলাদেশ শাখার ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মহিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লিবিয়ায় মানব পাচার চক্রের পাঁচজন চিহ্নিত। তাদের ধরতে গত বুধবার ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করেছে। আর লিবিয়া ছাড়া অন্যান্য দেশে মানব পাচারে জড়িত চক্রের ৩৮৭ সদস্যের বিষয়ে সন্ধান চালানো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে পাঁচজনের নামে রেড নোটিস জারি হয়েছে, তাদের মধ্যে তানজিলুর ওরফে তানজিলুম ওরফে তানজিদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার শ্রীনগর গ্রামে। সেসহ একই উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের জাফর ওরফে জাফর ইকবাল ও শম্ভুপুরের স্বপন আগে থেকেই লিবিয়ায় অবস্থান করছে। আর মাদারীপুর সদরের মধ্যাহাউসদি গ্রামের নজরুল মোল্লা ও ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের শাহাদাত হোসেনের অবস্থান জানা যায়নি।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি সূত্র জানায়, রেড নোটিসের আওতায় এসব ব্যক্তি যেকোনো দেশের স্থল, নৌ ও আকাশপথের বন্দরে গেলে গ্রেপ্তার হবে। এরপর সেই দেশের আইনকানুন পর্যালোচনা করে তাদের দেশে ফেরত আনা সম্ভব। এ পর্যন্ত ১৫ বাংলাদেশিকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে আনা সম্ভব হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২৮ মে লিবিয়ার মিজদাহ শহরে অভিবাসনপ্রত্যাশী ২৬ বাংলাদেশি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনায় গত ২ জুন ছয়জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন ও বনানী থানায় মানব পাচার মামলা হয়। মামলা তদন্তে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখতে পায়, উন্নত জীবনের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন নদী, গহীন জঙ্গল ও দুর্গম মরুপথ ব্যবহার করে মানব পাচার করত একটি চক্র। তারা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জিম্মি করে স্বজন থেকে মুক্তিপণ আদায় করত।
আকাশ মিয়া নামে এমনই এক ভুক্তভোগীর ভাই জানান, গত ৬ নভেম্বর ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি হওয়া মিন্টু মিয়া আগে থেকেই লিবিয়ায় অবস্থান করছে। তার বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার পল্টনে দুটি মামলা হয়েছে। মিন্টু কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার বোছামারা গ্রামের মৃত হেলাল উদ্দিনের ছেলে। সে ২০১৮ সালে দুবাই হয়ে লিবিয়ায় যায়। কিন্তু এখন তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে লিবিয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৮১ মানব পাচারকারীকে চিহ্নিত করেছে সিআইডি। এর মধ্যে ৩১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। আর বিদেশে অবস্থান করছে ২৭ জন। বিদেশে অবস্থানকারীদের মধ্যে ১৮ জনের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। লিবিয়ার গোলাগুলির ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় করা মামলাগুলোর মধ্যে চারটির চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে লিবিয়ার বাইরের তদন্তাধীন ৩৮৭ মানব পাচারকারীর।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২৮ মে অবৈধ পথে ইতালি পাঠানোর সময় লিবিয়ার মিজদাহ শহরে মানব পাচারকারীরা গুলি করে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জনকে হত্যা করে। এ ঘটনায় স্থানীয় দালালদের ধরতে তৎপর হয় দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৪ জুন রাতে ১৬ জনের নামে পল্টন থানায় মামলা করেন লিবিয়ায় ভুক্তভোগী যুবক রাকিবের বাবা মান্নান মুন্সী। তার বাড়ি শরীয়তপুরে। সাত মাস আগে দুই দফায় মোট ৭ লাখ টাকায় দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় গিয়ে আটকা পড়েন রাকিব। একই সময় পল্টন থানায় ৩৬ জনের বিরুদ্ধে এবং বনানী থানায় ৩৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা হয়। এর আগে ২ জুন পল্টন থানায় ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়। এদের মধ্যে রেড নোটিস জারি হওয়া ছয়জনও রয়েছে।
ঢাকা থেকে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা প্রথমে ভিজিট ভিসায় বাংলাদেশিদের শ্রীলঙ্কায় পাঠায়। সেখান থেকে দুবাই নেয়। আবার কখনো কখনো মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া নিয়ে যায়। সেখান থেকে দুবাই হয়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে নিয়ে আসে। এরপর সুযোগ বুঝে তারা ইউরোপে পাঠায়। এর আগে ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে রাখা হয়।
গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতে পেরেছে, সংঘবদ্ধ চক্রটি বিদেশিদের যোগসাজশে অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে আসছে। এই সিন্ডিকেটটি তিনটি ধাপে কাজগুলো করে। এর মধ্যে বিদেশে যাবে যারা তাদের নির্বাচন করা। পরে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। এরপর লিবিয়া থেকে ইউরোপ পাঠানোর প্রক্রিয়া করা হয়।
সূত্র জানায়, মানব পাচারকারী চক্রের দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের অল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে উন্নত দেশে গমনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে আকৃষ্ট করে থাকে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। পরে পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকিট ক্রয় ইত্যাদি এ সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। পরে তাদের এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রার্থীদের সামর্থ্য অনুযায়ী ধাপ নির্বাচন করে থাকে। ইউরোপ যাওয়ার ক্ষেত্রে ৭-৮ লাখ টাকা নেয়। এর মধ্যে বলা হয় সাড়ে ৪ লাখ বা ৫ লাখ টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার আগে দিতে হবে। বাকি টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার পর যাত্রীদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা আদায় করত।
ওই সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে এ চক্রের সদস্যরা বেশ কয়েকটি রুট ব্যবহার করে থাকে। রুটগুলো তারা সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী মাঝেমধ্যে পরিবর্তন অথবা নতুন রুট নির্ধারণ করে থাকে। সম্প্রতি লিবিয়াতে পাঠানোর ক্ষেত্রে যে রুটটি ব্যবহার হয়ে আসছে তার মধ্যে বাংলাদেশ হয়ে কলকাতা, মুম্বাই, দুবাই, মিসর, বেনগাজি ও ত্রিপোলি (লিবিয়া)। দুবাইয়ে পৌঁছে তাদের বিদেশি এজেন্টদের তত্ত্বাবধানে সাত-আট দিন অবস্থান করানো হয়ে থাকে। বেনগাজি হতে এজেন্টরা কথিত ‘মরাকাপা’ নামে একটি ডকুমেন্ট দুবাইতে পাঠিয়ে দেয়, যা দুবাইয়ে অবস্থানরত বিদেশি এজেন্টদের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ডকুমেন্টসহ বিদেশি এজেন্ট তাদের মিসর ট্রানজিট নিয়ে বেনগাজি পাঠায়। বেনগাজিতে বাংলাদেশি এজেন্ট তাদের ত্রিপোলিতে স্থানান্তর করে।
লিবিয়া থেকে যেভাবে ইউরোপ পাঠানো হয় : ত্রিপোলিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি কথিত কয়েকজন এজেন্ট অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গ্রহণ করে। অবস্থানকালীন এজেন্টদের দেশীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে ভুক্তভোগীর আত্মীয়স্বজন থেকে অর্থ আদায় করে। ত্রিপোলির ওই সিন্ডিকেট তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে পরে সমুদ্রপথে পাঠানোর জন্য নৌযান চালনা ও দিকনির্দেশনার প্রশিক্ষণ দেয়। এরপর নির্দিষ্ট রাতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌযান লিবিয়া থেকে তিউনেশিয়া উপকূলীয় চ্যানেল হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে ভূমধ্যসাগরের দুর্ঘটনায় প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।