সারা দেশে ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের নেতাদের বিরুদ্ধে বিবাহিতদের পদ দেওয়া, পদ দেওয়ার বিনিময়ে উপঢৌকন গ্রহণ এবং আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া শিবির ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদেরও কমিটিতে রাখার অভিযোগ রয়েছে। গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরের কাছে এসব অভিযোগ করেছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ এবং তৃণমূলের একাধিক নেতা। তারা বলেন, সাংগঠনিক টিমের বিরুদ্ধে কেন্দ্রে অভিযোগ করার পর ইতিমধ্যে পাঁচটি টিম পুনর্গঠন করা হয়েছে। এরপরও থামছে না অনিয়ম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগ আমাদের কাছেও আসছে। কেউ অভিযোগ করলে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বিভাগীয় টিমে পরিবর্তন আনা হয়েছে।’
নেত্রকোনা জেলা ছাত্রদলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, জেলার কেন্দুয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এতে বিবাহিতদের বাদ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বিবাহিত হওয়ার পরও বর্তমান কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল আলমকে নতুন কমিটিতে আহ্বায়ক করার জোর প্রচেষ্টা চলছে। সাইফুল জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব রফিক হিলালীর আত্মীয়। তদন্ত টিমকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন হিলালী। আলী ইসলাম নামে সংগঠনের এক নেতা তথ্য অধিকার আইন-২০০৯-এর ৮(১০) ধারায় সাইফুলের নিকাহনামা/কাবিননামার নকল কপি পেতে আবেদন করেছেন।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাজেদুল ইসলাম রুম্মন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাইফুল আলম বিবাহিত বলে তার প্রতিপক্ষরা অভিযোগ করলেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দেখাতে পারেনি।’
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্যকে কালীগঞ্জ সরকারি কলেজ শাখার আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক আমিনুর রহমান আমিন নিজ উপজেলা হওয়ার কারণে বিভাগীয় টিম ও জেলা ছাত্রদলের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদককে চাপ প্রয়োগ করে এ কমিটি গঠন করিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির একজনকে কলেজ শাখার আহ্বায়ক কমিটিতে রাখা হয়েছে। অত্যাচার-নির্যাতনের কারণে এলাকায় ছাত্রদলের রাজনীতি কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই এমনটা হয়েছে।’
গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি গঠনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জেলা ছাত্রদলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গাজীপুর সদর, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর উপজেলা ও পৌর এবং টঙ্গী পশ্চিম থানা আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। ছাত্রলীগের টঙ্গী পশ্চিম থানার নেতা সোহেল রানাকে দিয়ে সেখানকার আহ্বায়ক কমিটি গঠনের চেষ্টা চলছে।
তারা আরও বলেন, শ্রীপুর পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মামুন আকন্দ বিবাহিত বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভাগীয় টিমের কাছেও এ অভিযোগ ছিল। তবে বিষয়টি তদন্তের সুযোগ না দেওয়ায় প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মামুনের বিয়ের একটি ছবি পাওয়া গেছে। তাতে দেখা গেছে, মামুন তার স্ত্রীকে আংটি পরিয়ে দিচ্ছেন। কমিটি গঠনের সময় অভিযোগ ওঠার পরও মামুন আকন্দ প্রকাশ্যে বলে বেড়িয়েছেন তিনি নেতা হবেনই। কেউ তাকে বাদ দিতে পারবে না। অভিযোগ রয়েছে, ১০ লাখ টাকা নিয়ে টিমের ওপর চাপ প্রয়োগ করে মামুনকে নেতা বানিয়েছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্যামল।
মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি ফোনালাপও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে। জেলার শ্রীনগর উপজেলা নিয়ে কেন্দ্র গঠিত সাংগঠনিক রিপোর্ট অনুযায়ী, আরমান হোসেন লিমন মোড়লকে আহ্বায়ক ও আশরাফুল ইসলাম শুভকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। পরে ওই রিপোর্ট উপেক্ষা করে ‘মাই ম্যান নেতা’ রাখতে শুভকে বাদ দিয়ে সদস্য সচিব করা হয় দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থাকা জহিরুল ইসলাম বাদশাকে। রাজনৈতিক মামলায় শুভ এখন জেলে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সাংগঠনিক রিপোর্ট পাল্টে বাদশাকে সদস্য সচিব করেছেন।
নুর আলম সোহাগ ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক প্রার্থী। সংগঠনের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, সোহাগ ২০১২-১৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ছিলেন। চট্টগ্রাম সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের বায়তুল মাল সম্পাদক ছিলেন তিনি। দুর্নীতির অভিযোগে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল। অথচ ছাত্রদলেরই কিছু নেতা সংগঠনের স্থানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে শিবিরের রাজনীতি করা সোহাগকে আহ্বায়ক করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এ ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মের কথাও শোনা যাচ্ছে।
ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেন ও উপঢৌকন নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শ্যামল দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ‘ছাত্রদল এক বিশাল মহীরুহ। সারা দেশে এর কয়েক হাজার ইউনিট আছে। অতীতে যারা দায়িত্ব ছিলেন তারা আমাদের মতো এত কর্মযজ্ঞ নিয়ে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়েননি। সংগঠনের অভিভাবক ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের দিকে সবার চোখ রয়েছে। কমিটি গঠন করতে গিয়ে নানা অভিযোগ আসছে। আমরা সেগুলো তদন্ত করছি। সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নিচ্ছি। অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় ইতিমধ্যে সাংগঠনিক টিমগুলো পুনর্গঠন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় নেই। এরপরও সারা দেশে লাখ লাখ নেতাকর্মী রয়েছে। তারা নেতৃত্বে আসতে চায়। সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয় না বিধায় কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে নানা অভিযোগ করেন। তবে কোনো অনিয়মের সঙ্গে আমি জড়িত নই।’
ছাত্রদল নেতারা জানিয়েছেন, বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় গত ৬ অক্টোবর পাঁচটি টিম পুনর্গঠন করা হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগে চট্টগ্রাম, ফেনীর ফুলগাজী ও দাগনভূঁইয়া, সিলেট, ঝিনাইদহ, মুন্সীগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলা কমিটি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
বিভাগীয় টিমের অনিয়মের বিষয়ে ছাত্রদলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লা বিভাগীয় টিমপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। টিম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদককে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগীয় টিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে জেলা শাখার নেতাদের করা কমিটি পাল্টে দেওয়ার। চট্টগ্রাম বিভাগীয় টিমের প্রধান হচ্ছেন সহসভাপতি কেএসএম মুসাব্বির সাফি। তার সঙ্গে রয়েছেন সহসভাপতি পাভেল শিকদার, যুগ্ম সম্পাদক এবিএম মাহমুদ আলম সরদার, সহসাধারণ সম্পাদক মাইন উদ্দিন নিলয়, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমেদ সাব্বির। এ টিমের বিরুদ্ধে বান্দরবান জেলা সভাপতি আশরাফুল আমিন ফরহাদ ও সাধারণ সম্পাদক অমিত ভূষণ তঞ্চঙ্গ্যা কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। সম্প্রতি কক্সবাজার জেলার আওতাধীন ১৮টি শাখা কমিটি ঘোষণার পর অনৈতিক লেনদেন ও ত্যাগীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কমিটি বাতিলের দাবিতে শহরে বিক্ষোভ মিছিলও করেন বাদপড়া নেতাকর্মীরা।
খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমপ্রধান ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মিজানুর রহমান সজীবের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন অধিকাংশ জেলার নেতারা। গত ২৫ জুন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন তারা। এতে তারা বলেন, বিভাগীয় টিম অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। তারা অসৎ ও অনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করছে। প্রতিটি জেলায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বাইরে আলাদা বলয় তৈরি ও সংশ্লিষ্টদের আগামীতে বড় পদের আশ্বাস দিয়ে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ৬ অক্টোবর পাঁচটি বিভাগীয় সাংগঠনিক টিম পুনর্গঠন করা হলেও তাকে বহাল রাখা হয়েছে। আমরা তার বিরুদ্ধে অনাস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছি।