হল-মার্কের ননফান্ডেড ১২শ কোটি টাকার অনুসন্ধান ৭ বছর পর

দীর্ঘ সাত বছর স্থগিত থাকার পর বহুল আলোচিত হল-মার্ক গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির ননফান্ডেড (ঋণসুবিধা) অংশের ১২শ কোটি টাকার অনুসন্ধান শুরু করতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ জন্য আট সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করেছে কমিশন।

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে হল-মার্ক গ্রুপের ননফান্ডেড ঋণ জালিয়াতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০১২ সালে এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরুর পর ২০১৩ সাল থেকে এই অনুসন্ধান স্থগিত রাখে কমিশন। হল-মার্কের এই ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে দেশি-বিদেশি ৩৭টি ব্যাংকের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর আগে কমিশন ২০১২ সালের অক্টোবরে ফান্ডেড (সরাসরি) ঋণের বিষয়ে ৩৮টি মামলা করে। মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দেওয়ার পর বিচারকাজ চলছে। ফান্ডেড ও ননফান্ডেড সব মিলিয়ে হল-মার্কের মোট ঋণের পরিমাণ সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বেশি। যার পুরোটাই খেলাপি।

কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হল-মার্ক গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা নিয়ে যেসব অর্থ আত্মসাৎ করেছে, সেগুলোর অনুসন্ধানে কয়েক দিন আগে কমিশন আট সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে। যার প্রধান হচ্ছেন কমিশনের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী। অনুসন্ধান দলের অন্য সদস্যরা হলেন কমিশনের উপপরিচালক এস এম আক্তার হামিদ ভূঁইয়া, মশিউর রহমান ও সেলিনা আক্তার মনি, সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন ও সিলভিয়া ফেরদৌস এবং উপসহকারী পরিচালক সহিদুর রহমান ও আফনান জান্নাত কেয়া। দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য অনুসন্ধান দল গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অনুসন্ধান দলের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সোনালী ব্যাংকের শুধু হোটেল রূপসী বাংলা শাখা থেকেই ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় হল-মার্ক গ্রুপ। এসব ঘটনায় হল-মার্ক ও ব্যাংকের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মোট ৩৮টি মামলা করে কমিশন। এর মধ্যে প্রথমে ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর ১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা আত্মাতের অভিযোগে ২১ জনকে আসামি করে ১১টি মামলা করা হয়। মামলাগুলোর তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ৭ অক্টোবর ২১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০১২ সালে হল-মার্কের সহযোগী বিভিন্ন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে আরও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কমিশন ৩৫ জনকে আসামি করে আরও ২৭টি মামলা করে। কমিশনের সাত সদস্যের অনুসন্ধান দল মামলাগুলো তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। কিন্তু ননফান্ডেড প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়টির অনুসন্ধান ২০১৩ সাল থেকে সাময়িক স্থগিত থাকে। কমিশনের কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি, অবসরজনিতসহ নানা কারণে অনুসন্ধান দলটি ভেঙে গেলে ওই অনুসন্ধান সম্পন্ন করা যায়নি। তাই গত সপ্তাহে ওই কমিটিকে পুনর্গঠন করে ননফান্ডেড অংশটির অনুসন্ধান সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।

জানা গেছে, হল-মার্কের ঋণের ননফান্ডেড অংশের আওতায় সোনালী ব্যাংকের ব্যাক-টু-ব্যাক ক্রেডিট চিঠি গ্রহণের পরে কমপক্ষে ৩৭টি দেশি ও বিদেশি ব্যাংক হল-মার্ক গ্রুপকে ঋণসুবিধা দিয়েছিল।

দুদকের অনুসন্ধান দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে হল-মার্ক গ্রুপের আত্মসাৎ করা অর্থ আদায় করার স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও কমিশনের মধ্যে বেশ কিছু ত্রিপক্ষীয় চিঠি আদান-প্রদান হয়। ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষের অনুরোধে কমিশন ননফান্ডেড অনুসন্ধান সাময়িক স্থগিত রাখে। কিন্তু আশানুরূপ ঋণ আদায় না হওয়ায় কমিশন অভিযোগের ননফান্ডেড অংশ অনুসন্ধান করতে যাচ্ছে।

এদিকে গত আগস্ট মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান সাংবাদিকদের বলেন, ‘হল-মার্ক গ্রুপের আত্মসাৎকৃত অর্থ আদায়ে ব্যাংকের সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত আছে। গ্রুপটির বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলছে। দুদকের মামলাও চলমান আছে। আদালতের বাইরেও আমরা টাকা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

হল-মার্কের ঋণ আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে আতাউর রহমান প্রধান গতকাল শুক্রবার টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হল-মার্ক গ্রুপের ঋণগুলো আদায়ের বিষয়ে আমরা এখনো আশাবাদী, তবে সব ঋণ আদায় হয়তো সম্ভব হবে না। তাদের যেসব সম্পদ মর্টগেজ (জামানত) হিসেবে আছে, সেগুলো আমরা নিলাম করছি। গত পরশু (বুধবার) কিছু সম্পদ নিলামে বিক্রি হয়েছে। আরও কিছু প্রক্রিয়াধীন আছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জামানত রাখা সম্পদগুলো নিলামে বিক্রি সম্পন্ন করার পর আমরা আসলে বুঝতে পারব যে কতটুকু আদায় হয়েছে।’

হল-মার্ক গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি সামনে আসার পর দুদক যাদের বিরুদ্ধে মামলা করে তাদের মধ্যে হল-মার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ ওরফে তাফছির, হল-মার্ক গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার তুষার আহমেদ এবং গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তানভীরের স্ত্রী জেসমিন ইসলামসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ঋণ পরিশোধের শর্তে জেসমিনকে জামিন দেওয়া হলেও পরে তা বাতিল করা হয়। তানভীর ও তুষার বর্তমানে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।

মামলার অন্যতম আসামি সোনালী ব্যাংকের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক আজিজুর রহমান ২০১৪ সালের ২৫ আগস্ট কারাবন্দি অবস্থায় মারা যান। আর ঋণ কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন কবির বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঋণ জালিয়াতির মামলা থেকে বাঁচতে হুমায়ুন কবির প্রথমে মালয়েশিয়ায় আত্মগোপন করেন। পরে তিনি কানাডায় চলে যান। দুই দেশেই তার বাড়ি আছে। দুদকের ৩৮টি মামলাতেই তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে।

হল-মার্ক মামলায় দুদকের আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম জানিয়েছেন, হল-মার্কের ঋণ কেলেঙ্কারি মামলায় হুমায়ুন কবিরসহ সোনালী ব্যাংকের ৮-১০ জন কর্মকর্তা এখনো আত্মগোপনে।

হল-মার্কের ঋণ কেলেঙ্কারির অধিকাংশ মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন, কাগুজে প্রতিষ্ঠান আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের স্বত্বাধিকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের স্বত্বাধিকারী মীর জাকারিয়া, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. জিয়াউর রহমান ও অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. শহিদুল ইসলাম। এ ছাড়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখার (সাবেক শেরাটন শাখা, বর্তমানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল শাখা) সাবেক ব্যবস্থাপক ডিজিএম (সাময়িক বরখাস্ত) এ কে এম আজিজুর রহমান, সাবেক এজিএম মো. সাইফুল হাসান (সামায়িক বরখাস্ত), নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন (সাময়িক বরখাস্ত), অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসার মো. ওয়াহিদুজ্জামান ও সাবেক সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মেহেরুন্নেসা মেরী।

মামলার আসামির তালিকায় আরও রয়েছেন সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ুন কবির, প্রধান কার্যালয়ের তৎকালীন ডিএমডি মাঈনুল হক (ওএসডি) ও আতিকুর রহমান (ওএসডি), তৎকালীন জিএম আ ন ম মাশরুরুল হুদা সিরাজী, ননী গোপাল নাথ (ওএসডি), মীর মহিদুর রহমান (ওএসডি) ও সাবেক জিএম সবিতা সিরাজ, ডিজিএম ভগবতী মজুমদার (সাময়িক বরখাস্ত), শেখ আলতাফ হোসেন (সাময়িক বরখাস্ত), মো. সফিজউদ্দিন আহমেদ (সাময়িক বরখাস্ত) ও কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান (সাময়িক বরখাস্ত), আশরাফ আলী পাটোয়ারী (সাময়িক বরখাস্ত), মো. আবুল হাসান ও মো. খুরশিদ আলম।