পাহাড়ের রক্তের হোলি থামাতে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি করেছিল সরকার। এরপর কেটে গেছে ২৩ বছর। দুর্গম পাহাড়ে লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। শিক্ষার আলো পৌঁছেছে দূর পাহাড়ের পাদদেশে। তবুও থামেনি সংঘাত। সবুজঘেরা ঘন জঙ্গলময় এই স্বর্গরাজ্য প্রায়ই কেঁপে ওঠে গুলির শব্দে। ঝরে যায় প্রাণ, রক্তাক্ত হয় মৃত্তিকাপৃষ্ঠ। এমনকি মহামারী করোনাকালেও থামানো যায়নি রক্তের খেলা। গত ২৫ মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সংঘাতে মারা যায় অন্তত ২০ জন। আহতের সংখ্যাও অনেক। মূলত চারটি সশস্ত্র সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ সংঘাত বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আর জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) দাবি করছে, সরকারের কারণেই শান্তি ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যতদিন পর্যন্ত শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না ঘটবে ততদিন পাহাড়ে শান্তি আসবে না। তারা মনে করেন, পাহাড়িদের চারটি সংগঠনের
কর্র্তৃত্ববাদ ও আর্থিক স্বার্থ যেভাবে দিন দিন বাড়ছে তাতে অন্যপক্ষ সুবিধা নিচ্ছে। ২৩ বছর আগে যারা এ শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করছে তারা চুক্তির পর থেকেই মাঠে আছে। তাদের সঙ্গে নিয়ে একটি পক্ষ এখনো খেলায় মেতে আছে। আর এখন সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন সুবিধাভোগী দল। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পাহাড়ে শান্তিচুক্তি করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখনো সেই সরকার ক্ষমতায়। তাই এ সরকারকেই এই চুক্তির বাস্তবায়ন করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, পাহাড়ে যতদিন অবৈধ অস্ত্র থাকবে ততদিন এ অঞ্চলে চাঁদাবাজি, অপহরণ বন্ধ হবে না। কারণ সন্ত্রাসীরা অবৈধ অস্ত্র দিয়ে সবকিছু জিম্মি করে নিচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে শান্তির সুবাতাস পাহাড়ের মানুষ পুরোপুরি পাবে না। অস্ত্রের ভাষায় কেউ কথা বললে সেখানে উন্নয়ন থমকে দাঁড়ায়।
১৯৭৩ সালে পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন ও জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতির অধিকারে প্রতিষ্ঠিত জয় জেএসএস। ১৯৭৫ সালে দলটির সামরিক শাখা শান্তি বাহিনীর যাত্রা শুরু করে এবং সরকারের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এরপর থেকে টানা ২৪ বছর দুপক্ষের মধ্যে চলে রক্তক্ষয়ী লড়াই। শান্তি বাহিনীকে নিরস্ত্রীকরণ ও জেএসএসকে রাজনীতির মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিকে ‘শান্তিচুক্তি’ নামে অবহিত করা হয়। ওই সময় সন্তু লামরার নেতৃত্বে অস্ত্রধারীরা অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। সরকারও তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ পার্বত্যাঞ্চল বিশ্ববাসীর কাছে মুক্ত হয়।
পাহাড়ে সেই শান্তি বেশিদিন টেকেনি। চুক্তি স্বাক্ষরের বছর পেরোনোর মধ্যেই চুক্তিবিরোধী আরেকটি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গড়ে ওঠে। শুরু হয় জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। একপক্ষ আরেকপক্ষের লোকজনকে হত্যা করতে শুরু করে। সেই লড়াই কিছুদিন পর রূপ নেয় চাঁদাবাজি ও অপহরণ বাণিজ্যে। ২০০১ সালে তিন বিদেশি অপহরণ করা হয়। এছাড়া প্রায়ই স্থানীয় বাঙালি এমনকি পাহাড়ি প্রতিপক্ষের এলাকার মানুষজনকে অপহরণ করা হয়। ২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বের হয়ে ২০১০ সালে আরেক আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালে এসে ইউপিডিএফ থেকে বের হয়ে সৃষ্টি হয় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামের আরেকটি সংগঠন। এ চারপক্ষই পাহাড়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে আসছে। হত্যা করছে প্রতিপক্ষের লোকজনকে। মাঝেমধ্যে সরকারের বিভিন্ন লোকজন এমনকি সেনাবাহিনীর ওপরও হামলা করে আসছে। সবশেষ গত ১১ নভেম্বর কাপ্তাইয়ের ওয়ালাপাড়ায় স্থানীয় দুজনকে হত্যা করা হয়।
পাহাড়ে সংঘর্ষ চললেও থেমে থাকেনি উন্নয়ন। বর্তমানে বিশ্বের বুকে পার্বত্য অঞ্চল অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লাভ করতে শুরু করেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে একীভূত করা হচ্ছে। উঁচু পাহাড়েও পৌঁছেছে সৌরবিদ্যুতের আলো ও মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক। স্থাপতি হয়েছে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু রাঙ্গামাটিতেই নতুন করে তিনটি বেসরকারি কলেজকে সরকারি করা হয়ছে। স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। রাঙ্গামাটিতে চুক্তির আগে জেলায় ১২ হাজার পরিবার বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় থাকলেও বর্তমানে ৪৬ হাজার পরিবার বিদ্যুতের সুবিধা গ্রহণ করছে। দুর্গম বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়িতে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জেলায় শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়িরাও এখন সাধারণ বাঙালির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত হাজার হাজার পাহাড়ি শিক্ষার্থী।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, আইন যদি তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে তাহলে এখানে শান্তি আসতে বাধ্য। চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংগঠনের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হতাশাও। আর এ কারণে হানাহানির সংখ্যাও বাড়ছে। প্রাণহানি কমাতে হলে রাষ্ট্র ও শান্তিচুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে যেসব দল রয়েছে তাদের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হতে হবে।
সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেছেন, আপনি অনেক কিছুই উন্নয়ন করতে পারেন। কিন্তু মানুষের উন্নয়ন না হলে মানবসম্পদের উন্নয়ন না হলে সেখানে কোনো উন্নয়নই টেকসই নয়। আগে মানুষকে তার গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বাঁচার নিশ্চয়তা দিতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাহাড়ে সব ধরনের সংঘাতের অবসান হবে।
মানবাধিকার নেতা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সুনীল কান্তি বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে আকাক্সক্ষা নিয়ে শান্তিচুক্তি হয়েছিল তার বাস্তবায়ন একেবারেই কম। যতদিন যাচ্ছে ততই সংঘাত বাড়ছে। এখানে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে কেউ কেউ সুবিধা নিচ্ছে। তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ছে। আমি বলব, পাহাড়ে যে চারটি সংগঠন রয়েছে তারা আদর্শিক জায়গা লড়াই না করে আর্থিক সুবিধা নিতেই বেশি ব্যস্ত। তাই আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল হয়ে পাহাড়ে শান্তিফেরাতে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নের দিকে যেতেই হবে। যেভাবে বড় করে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতাকে তুলে ধরা হচ্ছে আসলে এখানে সেই পরিস্থিতি নেই।
এদিকে সংবিধানের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাংঘর্ষিক ও বৈষম্যমূলক ধারাগুলো সংশোধন করার দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ। পাশাপাশি চুক্তি পুনর্মূল্যায়নসহ আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার পদত্যাগ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও প্রত্যাহারকৃত নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প পুনঃস্থাপনেরও দাবি জানানো হয়। আজ বুধবার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাঙ্গামাটি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় তারা। এ সময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের রাঙ্গামাটি জেলা সভাপতি মো. শাব্বির আহম্মেদ।
সম্মেলনে বলা হয়, চুক্তির পর পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (প্রসিত) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এ অঞ্চলের অশান্তির সৃষ্টির মূল। তারা পার্বত্য অঞ্চলে চাঁদাবাজিসহ সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়ে আসছে। তাদের কাছে পাহাড়ি বাঙালিরা জিম্মি। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাঁদাবাজির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। সব ধরনের পেশার ওপর নির্ধারিত হারে চাঁদা ধার্য করে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদা না দিলে তারা হত্যা, গুম, অপহরণ, নির্যাতন চালায়। এদের অবসান না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ে শান্তি আসবে না। তাই তাদের নির্মূল করা জরুরি।