অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি মধ্য শীতে পিকনিকের (বনভোজন) উপযুক্ত পরিবেশের সুযোগ নিতে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই গিয়েছিলেন যশোরের একটি পিকনিক স্পটে। এ কারণে গতকাল বুধবার হাসপাতালটিতে গিয়ে কোনো চিকিৎসকের দেখা পাননি রোগীরা। কর্মদিবসে ছুটি না নিয়ে সরকারি চিকিৎসকদের সপরিবারে এমন আনন্দ ভ্রমণের ঘটনায় বিস্মিত হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কসহ কর্মরত অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তত্ত্বাবধায়ক (সুপার) রফিকুল ইসলাম বলছেন, বিষয়টি দুঃখজনক। এভাবে অনুপস্থিত থেকে গোপনে পিকনিকে অংশ নেওয়া সবার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতাল শূন্য রেখে গোপনে চিকিৎসকরা বনভোজনে গেছেনএমন তথ্য পেয়ে গতকাল বেলা ১১টায় এই প্রতিবেদক যান ২৫০ শয্যার মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, সেখানে চিকিৎসক দরকার ৬৪ জন, কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন। এর মধ্যে আবার চারজন রয়েছেন ছুটিতে। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় চিকিৎসকদের কক্ষ। যে জায়গা সব সময় সরগরম থাকে রোগীদের উপস্থিতিতে। কিন্তু গতকাল দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখা গেল চিকিৎসকদের দুটি কক্ষ খোলা, তবে কেউ নেই। অন্য কক্ষগুলোর সব কটি তালাবদ্ধ। রোগীরা দূর গ্রামগঞ্জ থেকে গিয়ে চিকিৎসক না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। চিকিৎসকরা নেই কেন, কোথায় গেছেন, কক্ষ এভাবে তালাবদ্ধ কেন এমন সব প্রশ্ন করলে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা ভীতসন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে একপলক তাকিয়ে কিছু না বলে সটকে পড়েন। ১২ কিলোমিটার দূরের মেহেরপুর সদর উপজেলার শোলমারী রুদ্রনগর গ্রাম থেকে চিকিৎসার জন্য আসা আকমল হোসেনের মতো ১০-১২ জনকে প্রশ্ন করলে তারা বলেন, রোগী নিয়ে হাসপাতালে এসে কোনো চিকিৎসক না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। চিকিৎসকের কক্ষে তালা, কখন আসবে নাকি আসবে না, সে বিষয়ে কেউ কিছু বলছে না।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক এম এ রশিদ, শিশু চিকিৎসক মাহাবুবা তানমিলা, সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ফজলুর রহমান ও আশিকুজ্জামান মানিক, চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের চিকিৎসক সফিউল্লাহ সবুজ, নাক, কান ও গলা বিভাগের চিকিৎসক এ এস গাজী শরীফ উদ্দিন আহমেদের কক্ষে তালা ঝুলছিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তারা ছুটি না নিয়েই যশোরে গেছেন পিকনিকে অংশ নিতে। গাইনি বিভাগের চিকিৎসক সোনিয়া আহমেদের কক্ষ খোলা পাওয়া গেলেও তিনি ছিলেন না। সেই কক্ষে ইন্টার্ন চিকিৎসক লিমা খাতুন রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। সব মিলিয়ে চিকিৎসকদের দ্বিতীয় তলায় যেখানে অন্যদিন রোগীর চাপে পা ফেলার জায়গা থাকে না, সেখানে গতকাল দেখা যায় সুনসান নীরবতা। কর্মদিবসে চিকিৎসকদের এমন অনুপস্থিতিতে বিব্রত হাসপাতালটির কর্র্তৃপক্ষও। পরিচয় দিয়ে অনুপস্থিত চিকিৎসকদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা এই প্রতিবেদককে বলেন, একটু বাইরে আছেন কাজে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৫০ শয্যার মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শতাধিক ইন্টার্ন চিকিৎসক (সেকমো) ও নার্স প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ইন্টার্ন কোর্স শেষ হয়ে যাওয়ায় তাদের এবং কিছু ক্লিনিক মালিকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয় পিকনিকের। মূলত ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সদের আরও এক বছর অতিরিক্ত কোর্স করার অবৈধ ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন এবং নির্দিষ্ট ক্লিনিকগুলোতে বেশি বেশি রোগী ও প্যাথলজি টেস্ট পাঠাতে উৎসাহিত করতে সপরিবারে সরকারি চিকিৎসকদের নিয়ে করোনকালের সরকারি নির্দেশ অমান্য করে ধুমধাম এই পিকনিকের আয়োজন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (সুপার) রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত বড় ঘটনা, অথচ চিকিৎসকরা আমাকে কিছুই বলেননি! সাংবাদিকদের কাছ থেকে শুনে ঘটনার সত্যতা পেলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে কর্মদিবসে গোপনে পিকনিকে যাওয়া ঠিক হয়নি। এটা খুবই অন্যায় কাজ হয়েছে। করোনাকালে ছুটি না নিয়ে চিকিৎসকদের অনুপস্থিত থাকা নিষিদ্ধ। তাই তারা গোপনে গেছে। তা ছাড়া যাদের ইন্টার্নি কোর্স শেষ হয়েছে, তাদের পুনরায় আরও এক বছর এই হাসপাতালে থেকে ইন্টার্নি করার অসাধু ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা হবে না। এ ছাড়া কর্মদিবসে ছুটি ছাড়াই গোপনে পিকনিকে যাওয়ায় অভিযুক্ত প্রতিটি চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেব।’