দেশের বিপুলসংখ্যক ক্যানসার রোগীর যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আটটি বিভাগীয় শহরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৩৮৮ কোটি ৩৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ে হাতে নেওয়া এসব হাসপাতাল নির্মাণ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর আটটি বিভাগীয় শহরে আটটি ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাস হয়। ইতিমধ্যে ছয়টি বিভাগীয় শহরে ক্যানসার হাসপাতাল স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঢাকা ও সিলেটে স্থান পরিবর্তন হওয়ায় এ দুটি হাসপাতাল নির্মাণের দরপত্রে কিছুটা জটিলতা দেখা দিলেও তা চলতি মাসের মধ্যেই সুরাহা করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকার হাসপাতালটি স্থাপিত হবে রাজধানীর উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে। রাজশাহীতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, রংপুরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, খুলনায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, বরিশালে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, ময়মনসিংহে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং সিলেটে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসার চিকিৎসায় বিশেষায়িত এ চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে। রাজধানীর উত্তরায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল ও সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেও কার্যক্রম শুরু হতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। স্থান নির্বাচন শেষ করে এ দুটি হাসপাতালের কাজও এ মাসেই শুরু হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যে সব কটি হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হবে।
গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, প্রস্তাবিত মেডিকেল কলেজ এলাকায় দুটি বেজমেন্টসহ ১৫তলা ফাউন্ডেশনবিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে বেজমেন্ট থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। বেজমেন্ট-১-এ গাড়ি পার্কিং; বেজমেন্ট-২-এ ব্যাংকার নির্মাণ, টিপিএস কক্ষ, চিকিৎসকদের কক্ষ, টয়লেট, প্ল্যানিং রুম, ব্রাকিথেরাপি মেশিনের পাশে ব্রাকি ইনসারশন কক্ষ, মিনি ওটি, রোগী নিবন্ধন কর্নার, মোল্ড রুমসহ নানা ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া প্রথম তলায় থাকবে ইমার্জেন্সি, ওপিডি, টিকিট কাউন্টার, ওয়েটিং রুম, তথ্যকেন্দ্র, সাক্ষাৎ রুম, কন্সলের রুম, ক্যানসার স্কিনিং রুম, ফলোআপ রুম, রিমার্কি রুম, ড্রাগ, ফিজিশিস্ট ও টেকনোলজিরুম, রেডিও থেরাপি টেকনোলজিস্ট রুম। দ্বিতীয় তলায় ডে-কেয়ার সেন্টার, মিনি কনফারেন্স রুম, লাইব্রেরি, প্রার্থনা কক্ষ ও নার্সেস রুম। তৃতীয় তলায় থাকছে দুটি ওটি, পোস্ট অপারেটিভ রুম, অ্যানেসথিয়েটিস্ট রুম ও নার্সিং স্টেশন। চতুর্থ তলায় ৫০ বেড, ডিউটি ডক্টরস রুম, নার্সিং স্টেশন, রেজিস্ট্রার রুম। পঞ্চম তলায়ও ৫০ বেড, ডিউটি ডক্টরস রুম, নার্সিং স্টেশন, রেজিস্ট্রার রুম থাকবে। ষষ্ঠ তলায় রেকর্ড রুম, অধ্যাপক রুম, কম্পিউটার ল্যাব ও রিসার্চ সেল, সপ্তম তলা থেকে নবম তলায় নেফ্রোলজি ইউনিট ও ডায়ালাইসিস সেন্টার। ১০ম থেকে ১২তলা পর্যন্ত থাকছে শিশু কার্ডিয়াক সেন্টার।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য হলো ক্যানসার চিকিৎসায় বৈদেশিকনির্ভরতা কমিয়ে আনাসহ দেশে ক্যানসার চিকিৎসাসেবা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। এসব হাসপাতালে সূচনাতেই ক্যানসার রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া ক্যানসার প্রতিরোধ ও স্ক্রিনিং সেবা, হাসপাতালভিত্তিক ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যানসার নিবন্ধন, ক্যানসারের অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, নারী ও শিশুদের ক্যানসারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মেডিকেল অনকোলজি, রেডিয়েশন অনকোলজি, সার্জিকেল অনকোলজি, ইএনটি ও হেডনেক ক্যানসার, গাইনি অনকোলজি, পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগ চালু করা হবে।
জানতে চাইলে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আটটি বিভাগীয় শহরে আমাদের আটটি বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। কাজগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করে আমরা মনিটরিং ও মূল্যায়ন কমিটি গঠন করেছি। এ কমিটি কাজের অগ্রগতিসহ সার্বিক বিষয়ে প্রতি মাসে প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। আর এই আটটি হাসপাতাল নির্মাণ শেষ হলে দেশের সব জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক মাইলফল সেবা নিশ্চিত হবে।’