ফেনী পৌরসভার সার্ভেয়ার মো. আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করে বন্দোবস্তির নামে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে ও নিজেদের সম্পত্তি রক্ষায় ভুক্তভোগীরা ফেনী সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিকট আবেদন জমা করেছেন।
স্থানীয়রা জানায়, ফেনী সদর উপজেলার ফরহাদনগর ইউনিয়নের কাটা মোবারকঘোনা গ্রামের আবুল কাশেম মাস্টার দীর্ঘদিন ফেনী পৌরসভার সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন। এ সুবাদে ফেনীর বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্য দেখিয়ে গ্রামবাসীকে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ভূমি অফিসে তথ্য গোপন করে প্রতিবেশীদের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি বন্দোবস্ত নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে বন্দোবস্ত আদেশ বাতিল করে বসতভিটা ও ফসলি জমি থেকে উচ্ছেদ ঠেকাতে এসিল্যান্ডের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা জানান, তারা পূর্বপুরুষদের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি ভোগদখলে আছেন। কিন্তু বিএস খতিয়ানে অসতর্কতাবশত তাদের নাম না থাকায় সম্পত্তিগুলো খাস জমিতে রেকর্ড হয়ে যায়। বিষয়টি জানাজানি হলে আবুল কাশেমের বাবা নুর ইসলাম সম্পত্তিগুলো চরাঞ্চল ও বেদখলে উল্লেখ করে একক মালিকানা দাবি করে ১৯৯২ সালে আদালতে মামলা করেন। পরে আদালত ভূমিগুলো ১২ প্রকৃত মালিককে বুঝিয়ে দেন। মামলা পরাজিত হয়ে নুর ইসলাম ২০০২ সালে আপিল করলেও ২০০৭ সালে তা খারিজ হয়ে যায়।
ফেনী সদর উপজেলা ভূমি অফিসের একটি সূত্র জানায়, ফেনী পৌরসভার সার্ভেয়ার আবুল কাশেম নিজেকে ভূমিহীন দাবি করে ২০১০ সালে ফরহাদনগর ইউনিয়নের মোবারকঘোণা এলাকার ১৩২ নম্বর মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানের ৩১১২, ৩১১৩, ৩১১৫, ৩১২৬, ৩১০৮ ও ৩১১৭ দাগে ১০০ শতক সরকারি খাস জমি বন্দোবস্তের আবেদন জানান। এর আগে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ফাজিলপুর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা থেকে ২০১০ সালের ২৫ এপ্রিল ওই ভূমি আবুল কাশেমের দখলে রয়েছে এবং তিনি ভূমিহীন মর্মে বন্দোবস্তের জন্য সুপারিশ করে সরেজমিন প্রতিবেদন করান। ওই প্রতিবেদনে আবুল কাশেমকে ভূমিহীন দাবি করা হলেও ৭৭৮ নম্বর খতিয়ান, ৩১৩ ও ৩১৪ নম্বর খতিয়ানে তিনি তিনি একর জমির মালিক। এ ছাড়া দিয়ারা জরিপ খতিয়ানেও তার নামে ভূমি রয়েছে। ফাজিলপুর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার ওই ভুয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভূমিহীন হিসেবে তাকে উল্লেখিত দাগে ১ একর জমি বন্দোবস্ত দেয় ভূমি অফিস।
সরেজমিনে ফরহাদনগর ইউনিয়নের মোবারকঘোনা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আবুল কাশেমের নামে বন্দোবস্তকৃত এই জমির ১২ শতকে বাবুল মিস্ত্রির বসতবাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া ২৬ শতকে স্থানীয় ইলিয়াছ, ৮ শতকে বসির আহম্মেদ ও ৫০ শতকে মর্তুজা ভূঞাদের ফসলি জমি রয়েছে। তারা শত বছর ধরে তাদের পৈতৃক এসব সম্পত্তিতে ভোগ দখলে রয়েছেন। বন্দোবস্ত নেয়া জমি দখলে নিতে বনু মাঝি বাড়িতে গেলে আবুল কাশেমকে তাড়া করেন বাসিন্দারা।
অভিযোগকারী ইলিয়াছ জানান, আবুল কাশেম ফেনী পৌরসভার একজন সার্ভেয়ার। তিনি কোটি টাকার মালিক। তিনি ভূমিহীন নন। তার তিন একরের বেশি সম্পত্তি থাকার পরও ভূমি কর্মকর্তারা টাকার বিনিময়ে আমাদের সম্পত্তি কাশেমকে বন্দোবস্তি দিয়েছে। কয়েক মাস আগে স্থানীয় ওমর ফারুক নিজ জমিতে দোকানঘর নির্মাণের সময় কাশেম বাধা দিয়ে ওই জমি নিজের বলে দাবি করেন। পরে ওই জমির মালিক ওমর ফারুকের মর্মে তার পক্ষে দোকানঘর নির্মাণে রায় দেন জনপ্রতিনিধিরা।
এ বিষয়ে ফরহাদনগর ইউপি চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন টিপু জানান, বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ না করায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। ২০১০ সালে আবুল কাশেমকে ভূমিহীন বলে ইউপি থেকে সনদ দেওয়া হয়েছে কি না বিষয়টি তার জানা নেই।
ফেনী পৌরসভার মেয়র হাজী আলাউদ্দিন জানান, যেহেতু ভুক্তভোগীরা পৌরসভার সার্ভেয়ার আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে এসিল্যান্ডের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে নিশ্চয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যায় করে কেউ পার পাবে না। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আমাদের করণীয় থাকলে আমরা সেটা অবশ্যই করব।
অভিযুক্ত আবুল কাশেমের বক্তব্য জানতে ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি তার কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানান। এ বিষয়ে তিনি ফেনী পৌরসভার মেয়র হাজী আলাউদ্দিনের কাছে প্রতিকার চাইবেন বলেও জানান।
ফেনী সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফখরুল ইসলাম জানান, অভিযোগ খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।