অনাকাঙ্ক্ষিত

স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দেশের মানুষের অভিযোগের বেশিরভাগই হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত। বিশেষত সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিপুলসংখ্যক রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা-সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতা সব সময়ই চোখে পড়ে। জনবল এবং অবকাঠামোগত অনেক সংকট সত্ত্বেও বাংলাদেশের চিকিৎসকদের যোগ্যতা ও সেবার মান যে অন্য অনেক দেশের চেয়ে খারাপ নয়, এ কথা অনেকেই স্বীকার করবেন। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও যে দেশের চিকিৎসকরা অনেক কঠিন রোগের চিকিৎসা এখানে ভালোভাবেই করছেন তার অনেক দৃষ্টান্তই রয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং সার্বিকভাবে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের সংখ্যাগত সংকট ইতিমধ্যেই প্রকট হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় বড় শহরগুলোর হাসপাতাল থেকে শুরু করে রাজধানীর বড় বড় সরকারি হাসপাতালসহ প্রায় সর্বত্র। আর যদি হাসপাতালের পরিচালনা কিংবা কোনো কোনো চিকিৎসকের অনিয়ম বা উদাসীনতায় রোগীরা চিকিৎসাবঞ্চিত হয় সেটা নিঃসন্দেহে খুবই অনাকাক্সিক্ষত।  

বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘হাসপাতালে কাতরাচ্ছে রোগী চিকিৎসকরা বনভোজনে!’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি এমনই এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি সত্ত্বেও সম্প্রতি যশোরের একটি পিকনিক স্পটে পিকনিক করতে যান। এ কারণে বুধবার হাসপাতালটিতে গিয়ে কোনো চিকিৎসকের দেখা পাননি রোগীরা। কর্মদিবসে ছুটি না নিয়ে সরকারি চিকিৎসকদের সপরিবারে এমন আনন্দ ভ্রমণের ঘটনায় বিস্মিত হয়েছেন হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়কসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। তত্ত্বাবধায়ক (সুপার) রফিকুল ইসলাম বলছেন, বিষয়টি দুঃখজনক। এভাবে অনুপস্থিত থেকে গোপনে পিকনিকে অংশ নেওয়া সবার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২৫০ শয্যার মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের কর্মকর্তারা বলছেন সেখানে চিকিৎসক দরকার ৬৪ জন, কিন্তু কর্মরত আছেন নিয়োগপ্রাপ্ত মাত্র ১১ জন চিকিৎসক। এর মধ্যে আবার চারজন রয়েছেন ছুটিতে। আর বাকিরা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই পরিবার-পরিজন নিয়ে পিকনিকে চলে গেছেন। ফলে দূর গ্রামগঞ্জ থেকে গিয়ে চিকিৎসক না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন রোগী আর রোগীর স্বজনরা। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে করোনার মধ্যে পিকনিকের আয়োজন প্রসঙ্গে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এত বড় ঘটনা, অথচ চিকিৎসকরা আমাকে কিছুই বলেননি! সাংবাদিকদের কাছ থেকে শুনে ঘটনার সত্যতা পেলাম।

করোনা মহামারীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং করোনা প্রতিরোধে জনগণের স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশের চিকিৎসকরা সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এমন বাস্তবতায় একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের এমন উদাসীনতা সত্যিই দুঃখজনক। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও খেয়াল করার মতো। করোনাকাল না হলেই কি হাসপাতালটির কয়েকজন চিকিৎসক একত্রে ছুটি নিতে পারতেন? হাসপাতালটিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক থাকলে হয়তো কোনো বিশেষ প্রয়োজনে কয়েকজন চিকিৎসক একত্রে ছুটি নিতে পারতেন। কিন্তু যেখানে মোট ১১ জনের ৪ জনই ছুটিতে, সেখানে বাকি চিকিৎসকরা এভাবে কর্মদিবসে হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকতে পারেন না। এটা কেবল উদাসীনতাই নয়, দায়িত্বহীনতাও বটে।

স্বাস্থ্যসেবায় জনবল গ্রহণযোগ্য মাত্রায় আছে কি না আন্তর্জাতিকভাবে সেটা বিচার করা হয় প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সংখ্যার অনুপাতে। এই বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৮টি সংকটাপন্ন দেশের মধ্যে একটি বলে চিহ্নিত। আইসিডিডিআর,বি ও ব্র্যাকের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য বাংলাদেশে মাত্র ৫.৪ জন ডাক্তার ও ২.১ জন নার্স রয়েছেন। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি ১০০০ মানুষের জন্য মাত্র ০.৫৮ জন চিকিৎসক-নার্স ও ধাই রয়েছেন। এই অনুপাত প্রতি হাজারে অন্তত ২.৫ জন হলেও স্বাস্থ্যসেবা চলনসই বলে মেনে নেওয়া যেত। স্বাস্থ্য জনবলের এই ঘাটতি অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির পরিচায়ক। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে এই ঘাটতি চরম আকার নিয়েছে। অন্যদিকে তার অনিবার্য ফল হিসেবে সারা দেশ থেকে রোগীরা রাজধানী ঢাকা বা বিভাগীয় বড় শহরগুলোতে আসায় বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আরও বাড়ে। জনগণের স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু বড় বড় হাসপাতাল তৈরি না করে আগে স্বাস্থ্য জনবলের জন্য যা প্রয়োজন সেদিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়োগ করা চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে হবে আর কেউ সেটা অমান্য করলে কঠোর হতে হবে। সারা দেশে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে বিশেষ মনোযোগ না দিলে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না।