প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে

করোনাকালে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সরকারের প্রণোদনার ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষক, প্রান্তিক উদ্যোক্তারা সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। তাদের হাতে টাকা পৌঁছানো না গেলে কর্মসংস্থান হবে কীভাবে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা তহবিল থেকে যে হারে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, সিএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের সে হারে ঋণ দেওয়া যাচ্ছে না। ঘোষণার সাত মাস পার হয়ে গেলেও ব্যাংকগুলোর সদিচ্ছার অভাবে প্রণোদনা প্রায় অর্ধেকই বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তদারকি বাড়াতে হবে। বাস্তবায়ন হার বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করতে হবে। ব্যাংকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে ব্যবস্থা নিতে হবে।

করোনা মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘কভিড-১৯ মোকাবিলা এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজ’ শীর্ষক এই সিরিজ মতবিনিময়ের দ্বিতীয় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এতে ‘কর্মসৃজন ও গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে জানিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজে অর্থনীতিতে অনেক গতি এসেছে। তারপরও  প্রণোদনার অর্থ সরকার পাঠালেও তার একটা বড় অংশ উপকারভোগীদের কছে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে অনেকেই এর উপকর ভোগ করতে পারছেন না।

তিনি বলেন, প্রণোদনার অর্থ আমরা পাঠাচ্ছি কিন্তু তার বড় একটা অংশ যাচ্ছে না। কারণ আমাদের চ্যানেলটা ব্যাংকিং। আমি কাউকে দোষ দেব না, এখানে অর্থ সচিব ও গভর্নর আছেন ব্যাংকগুলো থেকে অনেকেই সহায়তা পাননি। কেন এটা হলো?

তিনি বলেন, দেশের এসএমই খাতে টাকা যাচ্ছে না কিন্তু কেন? কারণ অধিকাংশ উদ্যোক্তার ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, তারা পারিবারিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন। তারা ব্যাংকে যান না আসেনও না। তাদের ব্যাংকের আওতায় আনতে উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে প্রণোদনা কাজে আসবে না।

গভর্নর ফজলে কবির বলেন,  বড় বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল তহবিল থেকে যে হারে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, সেই হারে সিএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া যাচ্ছে না। সিএসএমই খাতের ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে এ পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়েছে ৪১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এ ঋণ বিতরণে গতি আনতে দুই হাজার কোটি টাকার ক্রেডিট গ্যারেন্টি স্কিম চালু করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, করোনায় দুই ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। একটা হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতি, অন্যটা অর্থনীতির ক্ষতি। স্বাস্থ্য খাতের কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে সে বিষয়টি নিয়মিত আপডেট করবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটা নির্ধারণে আরও একটু সময় লাগবে। এটা এখনই বলা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ইতিমধ্যে প্রায় ৫৬ থেকে ৫৭ শতাংশ ঋণ বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারের দুটি উদ্যোগ প্রশংসনীয়। অর্থনীতিকে পুরোপুরি বন্ধ না করা এবং প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা। এসব উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল। ভবিষ্যতে অর্থনীতি সুরক্ষায় এখন থেকেই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

সিপিডির সিনিয়র ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, করোনাকালে গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু সরকারের প্রণোদনার ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষক, প্রান্তিক উদ্যোক্তারা সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন। তাদের হাতে টাকা পৌঁছানো না গেলে কর্মসংস্থান হবে কীভাবে। জিডিপি আসবে কোথাকে? এ জন্য কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন করতে আমাদের তরুণ সমাজকে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি দক্ষ জনবল হিসেবে তৈরি করতে সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে।

এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশ বলেন, কভিড-১৯ মূলত শহরে অর্থনীতিতে সমস্যা বাড়িয়েছে। করোনাকালে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রামীণ রূপান্তরমূলক অর্থনীতির সুবিধা পেতে হলে এ দেশকে বাজার ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামো উন্নয়ন যেসব হয়েছে, তা সংযুক্ত করতে হবে।

এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, করোনাকালে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ সময়োপযোগী হলেও এতে বড় উদ্যাক্তাদের ভাগ বেশি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করায় মূলধন হারিয়ে, ব্যবসা নতুন করে শুরু করতে পারছেন না। এর ফলে অনেকেই ঝরে পড়ছেন।