এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূ ধর্ষণ

ছাত্রলীগের ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে (১৯) দল বেঁধে ধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার ৬৫ দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য্য সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে ওই তরুণী বধূকে ছাত্রাবাসে তুলে নিয়ে সরাসরি ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে চারজনকে। তারা হলো সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম তারেক, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি ও অর্জুন লস্কর। এ ছাড়া তাকে জোর করে ছাত্রাবাসে নিয়ে যাওয়ার আগে এমসি কলেজসংলগ্ন একটি বাসায় একদফা ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে আরও দুজনকে। তারা হলো আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিজবাউল ইসলাম রাজন। এর বাইরে ধর্ষণে সহায়তা ও আলামত নষ্টের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুমকে। অভিযুক্ত আট আসামিই কারাগারে রয়েছে। তারা ছাত্রলীগের আনুষ্ঠানিক কোনো পদে না থাকলেও এমসি কলেজসংলগ্ন টিলাগড়কেন্দ্রিক ছাত্রলীগের একটি গ্রুপের সক্রিয় কর্মী। এই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকার।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) বিএম আশরাফ উল্যাহ বলেন, অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি করা হয়েছে সাইফুর রহমানকে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেপ্তার আট আসামির মধ্যে ছয়জন ধর্ষণে সরাসরি জড়িত। অন্য দুজন সহযোগিতা করেছে এবং ধর্ষণের পর আলামত নষ্টের চেষ্টা করেছে। আট আসামির ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টেও ছয়জন ধর্ষক হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। গত ২৯ নভেম্বর ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার হাতে এসে পৌঁছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার আট আসামিকেই আলাদাভাবে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। পরে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সিলেটের দক্ষিণ সুরমার এক তরুণী বধূ স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের প্রাইভেট কারে এমসি কলেজ এলাকায় বেড়াতে যান। সন্ধ্যার পর কলেজের প্রধান ফটক থেকে তাদের জোর করে গাড়িসহ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে পালা করে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর ধর্ষণের শিকার নারীর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় ছয় আসামির নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও দু-তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে র‌্যাব ও পুলিশ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদসহ তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটনায় জড়িত আরও দুজনকে আটক করে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়। এ ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটিসহ একাধিক কমিটি গঠিত হয়। হাইকোর্টের নিদের্শে গঠিত তদন্ত কমিটি সিলেটের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের হলরুমে ৪ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত এ ঘটনায় গণশুনানি করে। পরে কমিটির সদস্যরা এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনসহ সাক্ষীদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে ১৬ অক্টোবর ১৭৬ পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে জমা দেন তারা।

এদিকে ধর্ষণের ঘটনার পর কলেজ কর্র্তৃপক্ষ ২৬ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ ছাড়া ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত চার আসামির ছাত্রত্ব ও সনদ বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি তাদের স্থায়ীভাবে এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি এমসি কলেজে তদন্ত করতে আসে। তদন্ত শেষে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মুরারি চাঁদ কলেজকে (এমসি) কলঙ্কিত করেছে ঘটনাটি।

অস্ত্র মামলার অভিযোগপত্রেও সাইফুর ও রনি অভিযুক্ত : এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনার পর ওই রাতেই কলেজ ছাত্রাবাসে তল্লাশি চালায় পুলিশ। তল্লাশিকালে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানের দখলে থাকা কক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আলাদা আরেকটি মামলা করে। গতকাল এই মামলারও অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এতে অভিযুক্ত করা হয়েছে সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে।