অরাজনৈতিক বলে দাবি করা কয়েকটি ধর্মভিত্তিক সংগঠন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে অবিলম্বে তা বন্ধের দাবি জানালেও এই ইস্যুতে তারা এখন অনেকটাই নমনীয় বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তবে ভাস্কর্যবিরোধী অবস্থান নিয়ে ওই সংগঠনগুলোর নেতাদের দেওয়া বিভিন্ন হুমকিধমকিকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীনরা। তাদের এই অবস্থান ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনে করা হলেও কৌশলগত কারণে সরকারও নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। কিন্তু ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাদের প্রতিহত করার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে সরকার। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা এবং সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তারা আরও বলেন, ভাস্কর্য ইস্যুতে দেশে
আরেকবার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন এটা সত্য। তবে শাপলা চত্বরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যুতে কৌশলগত কারণে নমনীয় থাকলেও প্রয়োজন পড়লে কঠোর হবে সরকার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর হাতে দমন করবে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিষয়ে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম কৌশল হলো ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো যেমন ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে মাঠ কাঁপানোর চেষ্টা করছে। তেমনি ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকেও ভাস্কর্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জনসমর্থন আদায় করার চেষ্টা চলছে। এ উদ্দেশ্যে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এর পক্ষে কথা বলে জনসমর্থন প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে। এর মধ্য দিয়ে ভাস্কর্যবিরোধী শক্তির পরাজয় ঘটবে। ভাস্কর্য স্থাপন করা হবেই। এরপরের কৌশল হলো এরপরও ওলামা-মাশায়েখরা বাড়াবাড়ি করলে সরকার সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এই ইস্যুতে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাস্কর্য প্রতিস্থাপন নিয়ে সরকারের কৌশল নমনীয় হতে পারে, আবার প্রয়োজন পড়লে সর্বোচ্চ রকমের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনকে এখনো হালকাভাবেই নেওয়া হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যবিরোধী অবস্থান সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেই। বাড়াবাড়ির পর্যায়ে গেলে নিয়ন্ত্রণ করা হবে তাদেরকে।’
এই আওয়ামী লীগ নেতা আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে কঠোর অবস্থানে নেই। তাই সরকারও এ নিয়ে আপাতত তেমন জোরালো অবস্থানে নেই। তবে তারা কঠোর অবস্থান নিলে সরকার ও আওয়ামী লীগও কঠোর হবে এবং ভাস্কর্য স্থাপন হবেই।’
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের বক্তব্য নিয়ে আলেমদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এই সদস্য বলেন, ‘তবে সেনসিটিভ ইস্যুতে শুরুতে কথা বলায় এখন পিছু হটতে পারছে না তারা। তাহলে আলেমদেরও ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে। সরকারপন্থিরা আলেমদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এমন তথ্যই পেয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো এই ইস্যুতে প্রয়োজনে আমরা শক্তির পরীক্ষা দিতে মাঠে নামব।’
আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের আলেম-ওলামারা নিজেরাই ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি সভা করেছেন কীভাবে এখান থেকে (ভাস্কর্যবিরোধী অবস্থান) সরে আসা যায়। গত বুধবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বেশ কয়েকজন আলেম বৈঠক করেছেন। সেখানে হাদিসের আলোকে তারা কিছু ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দিতে চান তারা। সেটা করতে পারলেই ভাস্কর্য ইস্যুতে পিছিয়ে যাবেন আলেম-ওলামারা। তারাও এই ইস্যু থেকে বের হয়ে আসতে চান।’
ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলায় তার সংগঠনের ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শেষ কথা হলো মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য এ দেশে হবেই। কোনো শক্তি তা প্রতিহত করতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষের আবেগ-অনুভূতিতে মিশে আছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই দেশ সব ধর্মের মানুষের। এ দেশে মসজিদ যেমন থাকবে, মন্দিরও থাকবে। গির্জা, প্যাগোডা সবই থাকবে। এখানে প্রতিমা, মূর্তি ও ভাস্কর্য সবকিছুই হবে।’
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অনড় বলে জানিয়েছেন দলটির সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুজিববর্ষ উপলক্ষে এ দেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন হবেই। আমার মনে হয় বিরোধী পক্ষও আর বিরোধিতা করবে না। যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনে বিরোধিতা করেছে, তারা ইতিমধ্যে তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে বলে মনে করছি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ মাঠে নামলে কেউ আর মাঠে থাকে না।’
গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলার মাঠে ‘তৌহিদী জনতা ঐক্য পরিষদের’ ব্যানারে এক সমাবেশ থেকে মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করা হয়। একই দিনে রাজধানীর বিএমএ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে শানে রিসালাত কনফারেন্সে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা মামুনুল হকও প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করেন। এরপর গত ২৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এক মাহফিলে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল মামুনুলের। কিন্তু স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ তাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিলে তাকে ছাড়াই ওই মাহফিল হয়। তবে ওই মাহফিলে প্রধান অতিথি হেফাজতে ইসলামের আমির জুনাইদ বাবুনগরী হুমকি দেন, যেকোনো দল ভাস্কর্য বসালে তা ‘টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেওয়া’ হবে। আর এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ভাস্কর্য স্থাপনের সপক্ষে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনগুলো। এ ছাড়া বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠনগুলোও একই ধরনের কর্মসূচি পালন করছে। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কথা বলে ভাস্কর্য স্থাপনের সপক্ষে জনমত বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।