বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের জন্য কভিড-১৯ ‘নেগেটিভ’ সনদ বাধ্যতামূলক করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক)। আজ শনিবার থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বলে বেবিচকের ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড রেগুলেশনস বিভাগের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে। এর ফলে দেশি-বিদেশি কোনো এয়ারলাইনস এখন থেকে কভিড-১৯ ‘নেগেটিভ’ সনদ ছাড়া কোনো যাত্রীকে বাংলাদেশে আনতে পারবে না। আর নতুন এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত কূটনৈতিক মিশনগুলোর কূটনীতিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যসহ দেশি-বিদেশি সব যাত্রীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
এদিকে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশেন শাখায় দায়িত্বরতরা। আজ শনিবার থেকে বেবিচকের নতুন সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও করোনা নেগেটিভ সনদ না থাকলে কয়েক দিন আগে থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের। দেশি-বিদেশি সব নাগরিকের বেলায়ই এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। গত দুদিনে এভাবে কয়েকজন যাত্রীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে বেবিচক সদস্য (ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড রেগুলেশন) গ্রুপ ক্যাপ্টেন চৌধুরী এম জিয়াউল কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে, যা শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে এবং সেটা খুবই কঠিনভাবে নজরদারি করা হবে। করোনা নেগেটিভ সনদ না থাকলে কাউকেই দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না।’
জানা গেছে, গ্রুপ ক্যাপ্টেন চৌধুরী এম জিয়াউল কবীর স্বাক্ষরিত বেবিচকের নতুন সার্কুলারটি গত ৩০ নভেম্বর বিভিন্ন এয়ারলাইনসসংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, বাংলাদেশে আসার আগে সব যাত্রীকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পিসিআর ল্যাবে করোনা পরীক্ষা করাতে হবে। পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট এলে তবেই কোনো যাত্রী বাংলাদেশে আসার অনুমতি পাবেন। বিমানবন্দরে সেই মেডিকেল সনদ দেখাতে হবে যাত্রীদের। এরপর বিমানবন্দরে যাত্রীদের সবার তাপমাত্রা পরীক্ষাসহ মেডিকেল স্ক্রিনিং করা হবে। কারও মধ্যে করোনা সংক্রমণের লক্ষণ কিংবা উপসর্গ দেখা গেলে করোনা নেগেটিভ সনদ থাকলেও তাকে সরাসরি নির্ধারিত হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করে চিকিৎসা দেওয়া হবে এবং আইসোলেশন সেন্টারে পাঠানো হবে বলেও বেবিচকের নির্দেশনায় জানানো হয়েছে। এছাড়া যাদের মধ্যে উপসর্গ থাকবে না তাদের বাড়ি ফিরে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। তবে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা শিথিল করা হয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমইটি) কার্ডধারী বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিষয়েও কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তারা যে দেশ থেকে আসবেন, সে দেশের পিসিআর ল্যাবে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা সহজলভ্য না হলে, অ্যান্টিজেন বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য পরীক্ষার সনদ নিয়ে দেশে আসতে পারবেন।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশে অবস্থানরত কূটনৈতিক মিশনগুলোর কূটনীতিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও পিসিআর ল্যাবে করোনা পরীক্ষার সনদ থাকতে হবে এবং সেই পরীক্ষা যাত্রার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করাতে হবে। বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদেরও বাংলাদেশে আসতে করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে আসতে হবে। বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় যদি তাদের উপসর্গ না দেখা যায় এবং তারা যদি বাংলাদেশে ১৪ দিনের কম সময় অবস্থান করেন, তাহলে তাদের বাংলাদেশ ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হবে। কিন্তু ভাইরাসের উপসর্গ থাকলে তাদেরও পরবর্তী পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য আইসোলেশন সেন্টার ও হাসপাতালে পাঠানো হবে।
তবে শিডিউল বাণিজ্যিক ফ্লাইট ছাড়া রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ত্রাণ, মানবিক সাহায্য, প্রত্যাবাসন, বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত আনা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত কূটনৈতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এসব শর্ত প্রযোজ্য হবে না বলে বেবিচকের নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে যাবেন, তাদের সে দেশ ও এয়ারলাইনসের নিয়ম অনুসরণ করতে হবে বলে নির্দেশনায় জানানো হয়েছে। কোনো দেশে যাওয়ার জন্য করোনা নেগেটিভ সনদ বাধ্যতামূলক হলে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত হাসপাতাল থেকে পরীক্ষা করাতে হবে। এর বাইরে বিমানবন্দরে কর্মরতদের শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি যাত্রী, ক্রু ও উড়োজাহাজ জীবাণুমুক্তকরণের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করারও নির্দেশ দিয়েছে বেবিচক।
বেবিচক কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের কভিড নেগেটিভ সনদ বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়েছে। যেসব যাত্রীর সনদ থাকবে না তাদের টিকিট-ভিসা থাকলেও বোর্ডিং কার্ড ইস্যু করবে না সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস। বেবিচক এ বিষয়ে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে জানিয়েছে, ইউরোপ-আমেরিকায় শুরু হওয়া করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ যাতে বাংলাদেশে আছড়ে পড়তে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্কতামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। তবে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে সনদ ছাড়াই যাত্রী দেশে আসছিল। এ অবস্থায় দেশের করোনা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা নেগেটিভ সনদ আগেই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের ক্ষেত্রে করোনা নেগেটিভ সনদ আনার কথা বলা হলেও তা বাধ্যতামূলক ছিল না। এতদিন যদি কেউ সনদ না নিয়ে আসতেন তাহলে তাকে দেশে এসে লক্ষণ অনুযায়ী হোম কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হতো। কিন্তু সম্প্রতি সনদ ছাড়া যাত্রী আসার হার বাড়তে থাকে। শুধু নভেম্বরেই চার হাজারের বেশি যাত্রী আসেন করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া। এ আগমনের রাশ টানতে এবার সনদ বাধ্যতামূলক করা হলো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিজেন্ট এয়ারের সিইও আশীষ রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশি-বিদেশি সব এয়ারলাইনসই নতুন নির্দেশনা পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা সামাল দিতেই বেবিচক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা বেবিচকের নতুন নির্দেশনা সব স্টেশনকে জানিয়ে দিয়েছি। করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া ৫ ডিসেম্বর থেকে আর বোর্ডিং কার্ড ইস্যু করা হবে না।’
নতুন নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল বিমানবন্দরে দায়িত্বরত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শনিবার থেকে নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। নতুন নির্দেশনায় কূটনৈতিক ও ইউএন মিশনের প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেও সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমতির ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় হতে পারে।’
গতকাল শুক্রবারও দুজন বিদেশগামী যাত্রীর শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। একইভাবে বিদেশ থেকে আসার ক্ষেত্রেও আমরা করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক আছি। আশা করছি এতে মারাত্মক অবস্থা থেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা অনেকটাই নিশ্চিত হবে।’