ভোজ্য তেলের ফের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

অস্থির ভোজ্য তেলের বাজার। গত ১০ বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ। এক মাস ব্যবধানে খুচরায় সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। বছর ব্যবধানে এ বৃদ্ধির হার ১২ দশমিক ২০। বছরজুড়ে অস্থিরতার মধ্যেই আবারও পণ্যটির দাম বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে আমদানিকারক সমিতি। ১৫ দিনের মধ্যে ট্যারিফ কমিশনকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেছে মন্ত্রণালয়। চলতি সপ্তাহে কমিশন প্রতিবেদন দেবে। এরপরই দাম বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বছরজুড়ে আলোচনায় থাকা তিন স্তরের ভ্যাটনীতি প্রত্যাহার না হলে ভোজ্য তেলের দাম আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সয়াবিন তেলের বর্তমান সংকট ও নতুন করে দাম বাড়ানোর আবেদন বিষয়ে গতকাল শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা (মিলমালিক) নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। আগেও দিয়েছিল। আমরা সবাইকে নিয়ে বসব, দেখি কী করা যায়। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ভোজ্য তেল মিলমালিকদের সংগঠন ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ও টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোস্তফা হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে এখন ভোজ্য তেলের দাম বেশি। আমাদের অনেক সদস্য হাজার ডলারের কাছাকাছি মূল্যে এলসি খুলেছেন। এতে লিটারপ্রতি সয়াবিন তেলের খরচ ১৩০ টাকার আশেপাশে পড়বে। এজন্যই দাম বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে আমরাও কমাব।’

সরকারের বিপণন সংস্থা টিসিবির গতকাল শুক্রবারের বাজার প্রতিবেদনে বলা হয়, সপ্তাহ ব্যবধানে লিটারপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয় ১০০-১০৫ টাকা। এক মাস আগেও এটি ছিল ৯৫-৯৭ টাকা। আর গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮০-৮৫ টাকা। অর্থাৎ মাস ব্যবধানে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং বছর ব্যবধানে ২৪ দশমিক ২৪ শতাংশ দাম বেড়েছে। সপ্তাহ ব্যবধানে লিটারপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে গতকাল বোতলজাত সয়াবিন তেল ১১০-১২০ টাকায় বিক্রি হয়। এক মাস আগেও এটি ১০০-১১০ এবং গত বছরের একই সময়ে ছিল ৯৫-১১০ টাকা। অর্থাৎ মাস ব্যবধানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং বছর ব্যবধানে ১২ দশমিক ২০ শতাংশ দাম বেড়েছে।

গত বছরের অক্টোবর থেকে বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়া শুরু হয়। জানুয়ারিতে টনপ্রতি ৮০০ ডলারে পৌঁছায়। তখন মিলমালিকরা দাম বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্যারিফ কমিশনের মাধ্যমে বাজার বিশ্লেষণ করে ভ্যাট পুনর্নির্ধারণে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। কয়েক দফা আশ্বাস দিলেও অর্থ মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। এরপর করোনাকালে দাম কিছুটা কমে গেলে প্রস্তাবটি আড়ালে পড়ে। তবে গেল মে মাসে প্রতিটন যে সয়াবিন ৬৮১ ডলার দাম ছিল, জুনে তা এক লাফে হয় ৭৪৩ ডলার। জুলাইতে ৮৩৬ ও আগস্টে তা গিয়ে দাঁড়ায় ৮৬৭ ডলারে। এরপরই নড়েচড়ে বসেন আমদানিকারকরা। বিষয়টি আমলে নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এতে কোনো লাভ হয়নি। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম আরও বেড়ে সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে ৯২৯ ডলার হয়। যদিও বর্তমানে টনপ্রতি সয়াবিন তেল ৮২৬ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

গতকাল রাজধানীতে প্রতিলিটার খোলা পাম অয়েল ৯১-৯২ টাকা দরে বিক্রি হয়। গত সপ্তাহে ৮৬-৯১, এক মাস আগে ৮৪-৮৮ এবং গত বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৬৫-৭০ টাকা। অর্থাৎ মাস ব্যবধানে খোলা পাম অয়েলে ৬ দশমিক ৪০ এবং বছর ব্যবধানে ৩৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ দাম বেড়েছে। গতকাল লিটারপ্রতি সুপার পাম অয়েল বিক্রি হয় ৯৪-৯৬ টাকা দরে। গত সপ্তাহে ৯১-৯৪, এক মাস আগে ৯০-৯৩ ও গত বছরের একই সময়ে ৭০-৭৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। এক মাস ব্যবধানে পণ্যটির দাম ৩ দশমিক ৮৩ এবং বছর ব্যবধানে ৩১ দশমিক ০৩ শতাংশ দাম বেড়েছে।

আমদানিকারকরা বলছেন, ভোজ্য তেলের দাম নিয়ে সংকট শুরু হয় মূলত নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের পর। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ আইন কার্যকর হলে আমদানিকৃত ভোজ্য তেলের ওপর তিন স্তরের ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়। নতুন আইন অনুযায়ী অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের আমদানি পর্যায়ে বর্তমানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ছাড়াও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর দিতে হয়। উৎপাদন পর্যায়েও মূল্য সংযোজনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। এ ছাড়া ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের ওপর ১৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হয়। এতে লিটারপ্রতি সয়াবিন তেলের দাম ৩ টাকা বাড়ে।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বারবার আগের মতো এক স্তরে ভ্যাটের কথা বলে আসছি। প্রতিটনে আমরা ১৫ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে চাই। এখন যেভাবে চলছে, তাতে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে ভ্যাটও বাড়বে। আর ভ্যাট বাড়লে দামে প্রভাব পড়বে। এজন্য আগেই অনুমোদন নেওয়া থাকায় আমরা মিল পর্যায়ে দাম বাড়িয়েছি। আর নতুন করে লিটারপ্রতি ১৩০ টাকা দাম নির্ধারণের জন্য চিঠি দিয়েছি।’

তবে বিদ্যমান ভ্যাটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ভোজ্য তেল আমদানি সমিতির একাংশ। তারা চাইছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর ভ্যাট হার নির্ধারিত থাকুক। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আপনাআপনিই দাম বাড়বে-কমবে। কেবলমাত্র অতিরিক্ত দাম বাড়লেই সরকারের দ্বারস্থ হতে হবে।

এ বিষয়ে সমিতির সভাপতি মোস্তফা হায়দার বলেন, ‘আমাদের সমিতির একটি অংশ ভ্যাট আইনের কোনো সংশোধন চাইছে না। তবে আরেকটি অংশ চাইছে। আমরা আমাদের মতামত দিয়েছি। এখন বিষয়টি নির্ভর করছে মন্ত্রণালয়ের ওপর। আমি ব্যক্তিগতভাবেও চাই ভোজ্য তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকুক। ভ্যাট আইন সংশোধনের কোনো প্রয়োজন  নেই।’