প্রথম দিনের পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ করোনা নেগেটিভ

মাত্র ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্তে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানী থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের ১০ জেলায় এই পরীক্ষার উদ্বোধন করেন। এর মধ্যে নয় জেলায় পরীক্ষা শুরু হয়েছে। শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় মেহেরপুরে আজ রবিবার এই পরীক্ষা শুরু হবে। যেসব জেলায় পরীক্ষা শুরু হয়েছে, সেগুলো হলো গাইবান্ধা, মুন্সীগঞ্জ, পঞ্চগড়, মাদারীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, সিলেট, জয়পুরহাট ও পটুয়াখালী।

এই নয় জেলার মধ্যে আট জেলায় পরীক্ষার ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে ফল জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেবল মুন্সীগঞ্জের ফল তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে জানানো হয়নি। কারণ হিসেবে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. শহিদুল ইসলাম জানান, পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়ার পর সেই নমুনা অনলাইনের মাধ্যমে রাজধানীতে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) পাঠানো হবে। আইইডিসিআরে নমুনাগুলো আরটিপিসিআরের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। পরে দুই পদ্ধতিতে পাওয়া পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে অনলাইন ও এসএমএসের মাধ্যমে রোগীদের জানিয়ে দেওয়া হবে। গতকাল ১১ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

প্রথম দিন আট জেলায় অ্যান্টিজেন পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব জেলায় মোট ৫০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে ৪০ জনের করোনা নেগেটিভ ও ১০ জনের করোনা পজিটিভ এসেছে। সে হিসাবে মোট নমুনা পরীক্ষার ২০ শতাংশ করোনা পজিটিভ ও ৮০ শতাংশ নেগেটিভ এসেছে।

এর মধ্যে পঞ্চগড়ে তিনজনের নমুনা পরীক্ষা করে দুইজনের করোনা নেগেটিভ ও একজনের পজিটিভ; মাদারীপুরে চারজনের মধ্যে তিনজনের নেগেটিভ ও একজনের পজিটিভ এসেছে। যশোর ও পটুয়াখালীতে তিনজন করে ছয়জনের এবং জয়পুরহাটে নয়জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এই তিন জেলায় সবার করোনা নেগেটিভ এসেছে। গাইবান্ধায় পরীক্ষা করা ১২টি নমুনার মধ্যে ১১টি নেগেটিভ ও একটি পজিটিভ, ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ছয়টি নমুনার মধ্যে চারটি নেগেটিভ ও দুটি পজিটিভ এবং সিলেটে ১০ নমুনার মধ্যে অর্ধেক নেগেটিভ ও অর্ধেক পজিটিভ এসেছে।

মেহেরপুরে জেলা হাসপাতালে আজ রবিবার থেকে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হবে। এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রফিকুল ইসলাম আমাদের প্রতিনিধিকে বলেন, সাপ্তাহিক বন্ধের দিন থাকায় রোগীরা নমুনা দিতে আসেনি ও পরীক্ষা শুরু করা যায়নি। তবে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

প্রথম দিনের পরীক্ষার ফলের ব্যাপারে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার হাসপাতালে ১০টির মধ্যে ৫টিই নেগেটিভ। এটা হতেই পারে। এর আগে আমরা ট্রায়ালের জন্য যে টেস্ট করেছি তার ২৫টি টেস্টের মধ্যে ৫টি পজিটিভ পেয়েছিলাম। এই পরীক্ষার সঠিক মান ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কাউন্ট করা হয়।

মোট পরীক্ষার ৮০ শতাংশ নেগেটিভ, কারণ কী হতে পারে জানতে চাইলে এই চিকিৎসক বলেন, এখন ঋতু পরিবর্তনের সময়। শীতকাল। এখন শীতজনিত রোগের প্রকোপ বেশি। এসব রোগের সঙ্গে করোনার উপসর্গের মিল পাওয়া যায়। ফলে অনেকে আসছে করোনা কি-না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। এটাই বেশি নেগেটিভের মূল কারণ।

অবশ্য আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যাদের নেগেটিভ এসেছে তাদের আরটিপিসিআর করতে হবে। এজন্য ওইসব জেলা থেকে নমুনা আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে। তবে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার সঠিক মানের ব্যাপারে যারা ল্যাবরেটরিতে কাজ করছেন তারা বলতে পারবেন। এখন আগের মতো কমিউনিটি ট্রান্সমিশন না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে কমবেশি হতেই পারে। ফল নিশ্চয় আইইডিসিআরের সংক্রামক বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করবেন। তারপর হয়তো তারা নির্দেশনা দেবেন।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা বিনামূল্যে বলা হলেও জেলাগুলোতে নমুনা পরীক্ষার জন্য প্রত্যেকের থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে আরটিপিসিআর পদ্ধতিতে করোনা পরীক্ষা করতে সরকারি নির্ধারিত ফি দিতে হয়েছে সবাইকে। জেলা হাসপাতালের কর্মকর্তারা বলেছেন, ১০০ টাকা দিয়ে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হচ্ছে। যেসব রোগীর করোনা নেগেটিভ আসবে এবং তাদের নমুনা আরটিপিসিআর পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হবে, তাদের আর নতুন করে ফি দিতে হবে না।

শনিবার সকালে ভার্চুয়াল এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান পরীক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। উদ্বোধনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দ্রুত সময়ে করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্তের জন্যই এই অ্যাটিজেন টেস্টের ব্যবস্থা করা হলো। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও একধাপ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। অ্যান্টিজেন পরীক্ষা অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী করা হবে। অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় কোনো ব্যক্তির যদি নেগেটিভ ফলাফল আসে, তাহলে তাকে আবার আরটিপিসিআর পরীক্ষা করা হবে।

এ সময় সংক্রমণ এড়াতে সবাইকে মাস্ক পরার আহ্বান জানিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে করোনাভাইরাসের টিকা সঠিক সময় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। এখন আমাদের সামাজিক সুরক্ষা টিকা হিসেবে মাস্ক পরাকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

যে নয় জেলায় গতকাল থেকে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হয়েছে, সেসব জেলার দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিরা জানান জয়পুরহাট আধুনিক জেলা হাসপাতালে এই পরীক্ষা শুরু হয়েছে। যশোর আড়াইশ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে এ পরীক্ষা করা হচ্ছে। পঞ্চগড়ে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা হচ্ছে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে। মাদারীপুরে আড়াইশ শয্যার হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচতলায় পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়া হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জে পরীক্ষা হচ্ছে জেলার জেনারেল হাসপাতালে।

আমাদের প্রতিনিধিরা আরও জানান, এসব হাসপাতালে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হবে। তবে যাদের করোনার উপসর্গ আছে এবং চিকিৎসক যাদের পরীক্ষার জন্য চিহ্নিত করবেন, কেবল তাদেরই নমুনা নেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ করা হবে না। উপসর্গ থাকা প্রত্যেককে এসব হাসপাতালে আসতে হবে এবং পরীক্ষার জন্য ১০০ টাকা করে ফি দিতে হবে। অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় নেগেটিভ এলে তাদের নমুনা পরীক্ষার জন্য আরটিপিসিআর ল্যাবে পাঠানো হবে।