আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইন্দিরার আহ্বান

চার দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে সকাল ৮.৩০-এর ফ্লাইটে প্যারিস যাওয়ার পথে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে ম্যান্ডেট দিয়েছিল বিস্ময়কর সেই ম্যান্ডেট থেকে চলছে স্বাধীনতার আন্দোলন। গত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের জন্য জনগণ আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যান্ডেটের তুলনায় তা কিছুই নয়।

গতকাল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং বলেন, যেভাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী ভারতে আসছে তা তার দেশের জন্য ‘ভয়ংকর এক বোঝা’ এবং তা ভারতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এমনকি স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কলম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স স্কুলে স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতায় তিনি সতর্ক করে দেন যে, ভারত সহ্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্বায়ত্ত শাসনের সর্বব্যাপী আন্দোলন চাপা দেওয়ার জন্য যে নির্যাতন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে তার সেনাবাহিনী চালাচ্ছে তাতে ২৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত ৯০ লাখ শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করেছে।

পরবর্তী মাসগুলোতে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করছে এবং সীমান্তে বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ভারত দেশের স্বার্থরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধএত ঐক্যবদ্ধ ভারত আগে কখনো হয়নি। আমরা আপনাদের সাহায্য চাই, আমরা আপনাদের সমর্থন চাই, সহানুভূতি চাই। তবে যেখানে লড়াই প্রয়োজন ভারত একাই সেখানে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। পূর্ব পাকিস্তানের এই সংকটপূর্ণ অবস্থা আকস্মিক কোনো বিদ্রোহ থেকে সৃষ্টি হয়নি, বরং তা সামরিক শাসনের অধীনে অনুষ্ঠিত ‘অবাধ নির্বাচনের’ ফল। সীমান্তে কী ঘটছে তা যুদ্ধের হুমকি নয়, বরং পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যা ঘটে চলেছে তাই যুদ্ধের হুমকির উৎস।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অভিযানের শুরুর দিকেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে দেশদ্রোহের অভিযোগে বিচার করা হচ্ছে।

১১৮ স্ট্রিট এবং আমস্টারডাম অ্যাভিনিওতে স্কুল অব ইন্টারন্যাশনালের গেটে ৫০ জন ভারতপন্থি বাংলাদেশি সমর্থক সমবেত হয়ে ‘জয় হিন্দ’ এবং ইন্দিরা গান্ধী জিন্দাবাদ সেøাগান দেয়। প্রধানমন্ত্রী হেসে ও হাত নেড়ে তাদের অভিবাদন জানান। হলুদ ও গোলাপি শাড়ি এবং কালো ক্যাপ পরিহিত ইন্দিরা গান্ধী তখন এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭০৭-এ জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে অবতরণ করেন।

এয়ার ভাইস মার্শাল কপিল কাক (অব) লিখেছেন, ২৫ মার্চ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতের সাড়া পর্যবেক্ষণ করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, ভারত একইসঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইন্দিরা গান্ধী ও তার মুখ্য উপদেষ্টাগণ একমত হন যে, ভারতের জাতীয় স্বার্থ যেখানে হুমকির মুখে সেখানে যুদ্ধের আশ্রয় নেওয়া দরকার হতে পারে।

কে সুব্রামানিয়ামের যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য হয় যে, এক কোটি শরণার্থী লালনপালনের যে ব্যয়, যুদ্ধের ব্যয় তার চেয়ে কম। ভারত এই হিসাবটি সনাতন অর্থনীতির লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণ দিয়ে করেনি, সমকালীন পৃথিবীর অনেক যুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় স্বার্থরক্ষার কাহিনীও সামনে নিয়ে এসেছে।

১৯৭১-এর অক্টোবরের প্রথম দিকে ইয়াহিয়া খান তার সমর প্রস্তুতির মাধ্যমে যুদ্ধের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেন। পাকিস্তান পশ্চিম সীমান্তের বেসামরিক জনগণকে সরিয়ে সেনা মোতায়েন করতে শুরু করে।

২৫ নভেম্বর ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন, ‘আগামী দশ দিন আমি রাওয়ালপিন্ডিতে নাও থাকতে পারি। আমি তখন হয়ত যুদ্ধে লড়ব।’

পাকিস্তান সংকটটিকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে আসে যেখানে যুদ্ধই হয়ে পড়ে অনিবার্য একমাত্র পছন্দ। ভারতীয় অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব পড়বে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলবে। তারপরও ইন্দিরা গান্ধী সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠতম সিদ্ধান্তটিই নিলেন। যুদ্ধের মাধ্যমেই ভারতের স্বার্থরক্ষা করা যাবে। শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার জন্য তাদের নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করতে হবে।

ভারতীয় কর্মকৌশল তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে রচিত। প্রথমত, পশ্চিম পাকিস্তানের ভ্রান্ত বিশ্বাস যে চীনের সহায়তার পূর্বাংশের যুদ্ধে তারা জিতে যাবে। নভেম্বরের গোড়ার দিকে চীনফেরত ভুট্টো বলেছিলেন, তার সফরকালে চীন তাকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, পাকিস্তানের হয়ে লড়বে।

দ্বিতীয় বিষয়টি ছিল হিমালয়ের সন্নিকট রাষ্ট্র নেপাল, ভুটান, সিকিমের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, এ অঞ্চল ভারতের জন্য কৌশলগত বাফার জোনের কাজ করতে থাকে (পরে সিকিমকে ভারত নিজ দেশের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়)।

তৃতীয় বিষয়টি সম্পূর্ণ সামরিক, হিমালয়ের গিরিখাতে প্রবেশযোগ্যতা। বরফ আচ্ছাদিত এ গিরিখাত সম্পর্কে আমেরিকা ভালো অবহিত নয়। বছরের কিছু সময় আবহাওয়ার কারণে এ পথ তুষাররুদ্ধ ও অগম্য হয়ে ওঠে।

এই কর্মকৌশল অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে। পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতীয় এবং পূর্ব রণাঙ্গনে যৌথ কমান্ডের আক্রমণ সামলে ওঠা পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানিয়ে লেখেন :

হিজ এক্সিলেন্সি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আপনি ৪ ডিসেম্বর যে বার্তাটি পাঠিয়েছেন, তা আমাকে এবং ভারত সরকারে আমার সহকর্মীদের বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে। বার্তাটি পাওয়ার পর আপনারা যেভাবে আত্মনিবেদিত হয়ে বাংলাদেশকে পরিচালনা করছেন, সেই দেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি ভারত সরকার পুনরায় বিবেচনা করে।

আমি হৃষ্টচিত্তে আপনাকে জানাতে চাই, বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে নিশ্চয়ই তার আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ সকালে এ বিষয়ে আমি আমাদের সংসদে একটি বিবৃতি দিয়েছি। বিবৃতির অনুলিপি সংযুক্ত করছি।

বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভুগতে হয়েছে। আপনার তরুণ ছেলেরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মবলিদানের সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতের জনগণও একই আদর্শের প্রতিরক্ষায় লড়ে যাচ্ছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, এই শ্রেষ্ঠতম উদ্যোগ এবং আত্মদান ভালো কাজের জন্য আমাদের আত্মনিবেদনকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্ব অক্ষুণœ রাখবে। যা হোক, পথ যত দীর্ঘই হোক, আত্মদান যত বেশিই হোক, আমাদের দুই দেশের মানুষের ভবিষ্যতে ডাক পড়বে, আমি নিশ্চিত আমরা বিজয়ীই হব।

ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে, আপনার সহকর্মীদের এবং বাংলাদেশের বীর জনতাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ নিচ্ছি।

আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিজ এক্সিলেন্সি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আমার সর্বোচ্চ সম্মানের নিশ্চয়তা জ্ঞাপন করবেন। (চিঠিটি নিবন্ধকারের বিদেশির চোখে ১৯৭১, ২০১২-তে প্রকাশিত)।