দেশের কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এখন থেকে কোর্স দুটি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এককভাবে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বীকৃত সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং ইনস্টিটিউট কোর্স দুটিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারবে এবং এসব প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারবেন। তবে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও নার্সদের মধ্যে যাদের শিক্ষা কারিকুলাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন কারিকুলামের সঙ্গে মিলবে, তাদের ব্যাপারে সরকারি চাকরির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে সুপারিশ করেছে এ সংক্রান্ত গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি।
এর মধ্য দিয়ে এ কোর্স দুটি পরিচালনা নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণায়ের মধ্যে চলে আসা ১৫ বছরের দ্বন্দ্বের অবসান হলো। দূর হলো কোর্স পরিচালনা নিয়ে জটিলতা।
জানা গেছে, বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি-বেসরকারি ১১০টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৩০৯টি মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। গত ৪ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের কারিগরি-২ শাখা এ সংক্রান্ত এক গেজেট প্রকাশ করে। গেজেটে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আইন ২০১৮-এ তফসিল-১ এর ক্রমিক নং ১ এর দফা ‘ঞ’ এবং ক্রমিক নং ৪-এর দফা ‘ক’ ও ‘ঘ’ বিলুপ্ত করা হয়। বোর্ডের আইনের ২০১৮-এর ধারা ২৬-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে উল্লিখিত দফা সংশোধন করা হয়েছে বলে গেজেটে উল্লেখ করা হয়। এর ফলে এতদিন ধরে কারিগরি বোর্ড পরিচালিত মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স পরিচালনা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানায় স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেটা গেজেট করা হয়েছে, সেটা আমরা করবই। এটা নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই। কোর্স দুটি পরিচালনার ক্ষেত্রে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট নির্দেশনা আছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দেশনা আছে। আমরা সেটা নিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যÑ দুই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছি।
সে ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে যারা পাস করেছে, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দুই মন্ত্রণালয় মিলে একটি কমিটি হয়েছে। কমিটি বিভিন্ন কাগজপত্র বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে।একটি সরকারি হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দাবি ছিল কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কোনো অবস্থাতেই মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং সংক্রান্ত কোনো কোর্স পরিচালনা করতে পারে না। ওই বোর্ডে এ কোর্স পরিচালনা জন্য কোনো বিশেষজ্ঞও নেই। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড যখন কোর্স দুটি চালু করে, তখন ২০০৭ সালে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিও একই মন্তব্য করে। কিন্তু বোর্ড সেটা মানছিল না। পরে কারিগরি বোর্ড থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নিয়োগ সংক্রান্ত একটি মামলা হয়। সেখানে ওরা দাবি করে তাদেরও সরকারি চাকরি দিতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসক অনুষদের অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ব্যতিরেকে অন্য কাউকে চাকরি দেওয়া যাবে না। ওই মামলা শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশনে যায়। তখন অ্যাপিলেট ডিভিশন এক নির্দেশনায় বলেন, কারিগরি বোর্ড থেকে যারা পাস করেছেন তারা চাকরি পাবেন, এমন নয়। তবে তারা নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। অ্যাপিলেট ডিভিশনও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কোর্স দুটি পরিচালনার পক্ষে বলেন। কিন্তু এ নির্দেশনা মানে না কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। আবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও নির্দেশ বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয় না। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করা হয় এবং তার নির্দেশনায় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এই জ্যেষ্ঠ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আরও বলেন, শুরু থেকেই কোর্স দুটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো। মাঝখানে বিধিবহির্ভূতভাবে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড পরিচালনা করেছে। এখন আবার আগের মতোই পরিচালিত হবে।
সে ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত কোর্সের শিক্ষার্থী ও পাস করা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও নার্সদের কী হবেÑ জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাদের ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি সুপারিশ করেছে, যারা পাস করেছে তাদের ভর্তির প্রক্রিয়া, রেজিস্ট্রেশন, সনদ, কোর্স কারিকুলাম সংক্রান্ত সমস্ত কাগজপত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একটি মনিটরিং সেল এসব কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের সরকারি চাকরির বিষয়টি বিবেচনা করবে। এসব শিক্ষার্থীর দোষ নেই। দোষ হলো কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। তারা ভর্তি না করালে এসব ছেলেমেয়ে ভর্তি হতো না।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের ক্ষেত্রে এ দুটি কোর্সে ভর্তির নিয়ম হলো শুধু বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাই ভর্তি হতে পারবে এবং শিক্ষার্থীর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞানে টু পয়েন্ট ফাইভ মার্ক থাকতে হবে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে যেকোনো সালের, যেকোনো বিষয়ের শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারত। এটা তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোর্সের সঙ্গে মিলে না। ফলে এদের মধ্যে যাদের মিলবে, তাদের চাকরির ব্যাপারে বিবেচনা করবে সরকার।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. সেলিম মোল্লা কারিগরি শিক্ষা বোর্ড আইন ২০১৮-এর মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স পরিচালনা সংক্রান্ত তফসিল বিলুপ্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু এ সংক্রান্ত আইনের তফসিল সংশোধন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। সর্বোচ্চ আদালতের এবং আন্তঃমন্ত্রণালয়ের কমিটির সব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
অনুরূপভাবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়েরকারী বেকার অ্যান্ড প্রাইভেট সার্ভিসেস মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট চার বছরেও বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এখন অবিলম্বে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট বাস্তবায়ন করতে হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রণালয়ের কার্যবিধি অনুযায়ী মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং সংক্রান্ত শিক্ষা কার্যক্রম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালযের আওতাভুক্ত। ১৯৬২ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ কোর্স দুটি পরিচালনা করে আসছে। ২০০৫ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনা শুরু করলে জটিলতা সৃষ্টি হয়। গত ১৫ বছর ধরে এ নিয়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। জটিলতা নিরসনে ২০০৭ সালে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের কমিটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্টের আওতায় পরিচালনার সুপারিশ করে। কিন্তু এ সুপারিশ উপেক্ষা করে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কোর্স পরিচালনা অব্যাহত রাখায় জটিলতা আরও বাড়ে।
এ ব্যাপারে মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা জানান, এ জটিল পরিস্থিতিতে ২০১৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা এতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ না পাওয়ায় তারা হাইকোর্টে মামলা করেন। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নেওয়া হলে ২০১৬ সালের নভেম্বরে সর্বোচ্চ আদালত ২০০৭ সালে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশের আলোকে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। কিন্তু মেডিকেল টেকনোলজির জটিলতা দূর না করেই ২০১২ সাল থেকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড নতুন করে নার্সিং কোর্স পরিচালনা শুরু করে। এতে জটিলতা আরও বেড়ে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি হাসপাতালের আরেকজন মেডিকেল টেকনোজিস্ট দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর গত বছর নভেম্বরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, নার্সিং কাউন্সিল ও রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের ঊর্ধ্বতন আট কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠিত হয়। কমিটি গত বছর ২ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দাখিল করা প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের সিভিল পিটিশন লিভ টু আপিল নং ২১৪৩/২০১৬ মামলার নির্দেশনা মোতাবেক মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স সংক্রান্ত সব শিক্ষা কার্যক্রম ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্টের আওতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক পরিচালিত হবে। কমিটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স বন্ধ করতে বোর্ডের আইন-২০১৮ সংশোধনেরও সুপারিশ করে। এমনকি ওই আইনের তফসিলের ১ এর ক্রমিক নং ১(ঞ) এবং ৪ সহ, উক্ত তফসিলে উল্লিখিত মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বিধানাবলি বিলুপ্ত বা সংশোধন করে ৩০ দিনের মধ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগকে কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ গড়িমসি শুরু করলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়াধীন প্রতিষ্ঠান থেকে পাসকৃত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, নার্স এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদানসহ কর্মবিরতি কর্মসূচিও পালন করে।