বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বিতর্ক ও আমাদের উন্নয়ন

বর্তমানে রাজনীতির নিরুত্তাপ ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাতিল করার দাবি জানিয়ে ইসলামি দলগুলোর একাংশ নতুন এক বিতর্কের সূচনা করেছে। অন্তত দুজন রাজনীতিক একজন চরমোনাইর পীর ও ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হক এই দাবির মুখপাত্র হিসেবে সামনে এসেছেন। এরই মধ্যে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর একটি নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙ্গা হয়েছে আর সেই অপরাধে চারজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। শাসক দলের অনেক নেতা ও মন্ত্রী এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক ইস্যুর মতো আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান খোঁজার কথা বলেছেন। আসলে এটা একটা মীমাংসিত বিষয়; মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এর নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর যেকোনো বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হলে সৌহার্দ্যরে পরিবেশ তৈরি হয়, শান্তির পথ প্রশস্ত হয়, তাতে নাগরিকরা স্বস্তিবোধ করে থাকেন আর অর্থনীতির চাকা থাকে সচল। তাই আলোচনায় অরুচি থাকা কাম্য নয়।

ভাস্কর্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ত্রিমাত্রিক শিল্পমাধ্যম। এই অঞ্চলে এ শিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য থাকলেও সাম্প্রতিক ইতিহাসে এর উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষকতা দেখা যায়নি। তবে, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান’ আমলেও এ দেশে অনেক ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে; ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশেও হয়েছে। আমাদের ধর্ম ইসলামের পুণ্যভূমি সৌদি আরবেও ভাস্কর্য আছে। ইরাক, ইরান ও তুরস্কে ভাস্কর্যের ছড়াছড়ি। পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশেও ভাস্কর্যের কমতি নেই। আর নিউটন যখন বিজ্ঞানের নতুন নতুন সূত্র আবিষ্কার করে যাচ্ছিলেন, তখন ভারতবর্ষে মুসলিম মোগল শাসকরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যতটা নয়; তার চেয়ে ঢের বেশি চিত্রকলা ও নৃত্যকলার পৃষ্ঠপোষকতা করে চলছিলেন। এই পটভূমিতে এখন জাতির পিতার ভাস্কর্য নিয়ে কেন বিতর্ক এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে, তা অবশ্যই গবেষণা করে দেখার বিষয়।

কভিডের আগে এবং কভিড চলাকালে বাংলাদেশ যে প্রবৃদ্ধির হার প্রদর্শন করেছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা কুড়িয়েছে। কভিড-উত্তর সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বেলায় আমাদের শুধু দ্রুত পূর্বাবস্থায় ফিরে গেলেই চলবে না, ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই আমাদের দৌড়ের গতি অনেক বাড়াতে হবে। আর ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে আমাদের সেই দৌড়কে একশ মিটার স্প্রিন্টে রূপান্তর করতে হবে। এই অভিযাত্রায় পথিমধ্যে উটকো যেকোনো ঝামেলা হবে কাবাব মে হাড্ডি। এখানে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার উন্নয়ন পরিক্রমার দু-একটি বিষয় প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

কৃষিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদশূন্য সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন এবং শিল্পায়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউয়ের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বিশিষ্ট ওলন্দাজ শিল্পপতি ড. আলবার্ট উইনসেমিয়াস। তিনি তার প্রথম প্রতিবেদনে দুটি জিনিসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। সে দুটি হলো : ক. সাম্যবাদীদের দেশ থেকে নির্মূল করতে হবে; তারা যেকোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অসম্ভব করে তোলে এবং খ. স্যার স্টামফোর্ড র‌্যাফেলসের ভাস্কর্য অপসারণ করা যাবে না।

উইনসেমিয়াস জানতেন যে, সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের জন্য ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বিনিয়োগ আনতে হলে বড়মাত্রার কারিগরি, ব্যবস্থাপনাগত, বিনিয়োগ ও বাজারজাতকরণ-সংক্রান্ত জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন হবে। বিনিয়োগকারীরা দেখতে চাচ্ছিলেন যে, নতুন সরকার আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশ কূটনীতিবিদ স্যার থমাস বিংলে র‌্যাফেলসের ভাস্কর্যের প্রতি কী আচরণ করে। ভাস্কর্যের সুরক্ষিত থাকাটাকে তারা ব্রিটিশ ঐতিহ্য বর্জনের পরিবর্তে তা লালনের সংকেত হিসেবে গ্রহণ করবে; এর ইতিবাচক প্রভাব তাদের মনে এক প্রতীতি তৈরি করবে।

দেশোন্নয়নে নতুন নতুন ধারণা নেওয়ার জন্য লি ১৯৬৮ সালে কিছুদিনের জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে তার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দুটো কৌশলের ওপর তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। প্রথমটি হলো ইসরায়েলের মতো বৈরী অঞ্চল ডিঙিয়ে (Leapfrog)) ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটানো। আর দ্বিতীয় কৌশলটা ছিল তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে প্রথম বিশ্বমানের একটি ‘মরূদ্যান’ তৈরি করা। লির ধারণা ছিল, সিঙ্গাপুর যদি প্রথম বিশ্বের মান অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ ও অন্যান্য সেবা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তবে সেটা হবে এ অঞ্চলে ব্যবসা করার জন্য বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী, ব্যবস্থাপক ও অন্য পেশাজীবীদের জন্য একটি মূল ছাউনি-স্বরূপ। এটি করার জন্য যে কাজটা করা প্রয়োজন, তা হলো লোকজনকে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করা, যাতে করে তারা প্রথম বিশ্বমানের সেবাদানে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। একাজ করা খুবই সম্ভব স্কুল, কলেজ, শ্রমিক সংগঠন, কমিউনিটি সেন্টার, সামাজিক সংগঠন প্রভৃতির সহায়তায় সাধারণ মানুষের ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন আনার মাধ্যমে। তার আরও বিশ্বাস ছিল যে, গণচীনে সাম্যবাদীরা যদি দেশে মশা-মাছি নির্মূল করতে পারে, তবে তিনি অবশ্যই দেশের মানুষের তৃতীয় বিশ্বের বদ-অভ্যাসগুলো পরিত্যাগ করাতে সমর্থ হবেন। কারণ, তার সামনে কোনো বিকল্প ছিল না; বাঁচতে হলে তাদের অঞ্চলের মধ্যে অধিকতর দক্ষ, সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত হতে হবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমান তালে চললে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই; তাদের চেয়ে এগিয়ে চলতে হবে। কারণ, সব প্রতিবেশীরই কম-বেশি দেশজ বাজার এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। সিঙ্গাপুরের এ দুটির কোনোটিই নেই।

মালয়েশিয়া এখন একটি উন্নত মুসলিম দেশ। ১৯৬৫ সালে এ দেশে চাইনিজ বংশোদ্ভূত ধনকুবের লিম গো টং সরকারি প্রাক্কলনে ১৫ বছরে সমাপ্য প্রকল্প যখন মাত্র পাঁচ বছরের প্রচেষ্টায় শেষ করে ১৮০০ মিটার উচ্চতার গেন্টিং হাই-ল্যান্ডের চূড়ায় বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণে সক্ষম হন, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টুংকু আবদুল রহমানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে কট্টরপন্থিদের শত বাধা সত্ত্বেও সেখানে ক্যাসিনো স্থাপনের অনুমতি দেন। তবে সেখানে প্রবেশাধিকার পান শুধু বিদেশি পর্যটকরা; স্বদেশিদের সেখানে প্রবেশ নিষেধ। ২০১৯ সালে এই গেন্টিং গ্রুপের বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়ায় ২.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মালয়েশিয়ার আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই বিনোদন কেন্দ্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা হলেও স্যার র‌্যাফেলস ছিলেন একজন ঔপনিবেশিক প্রতিনিধি। তার পরও শুধু উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে স্বাধীন সিঙ্গাপুরের অধিবাসীরা তার ভাস্কর্য সসম্মানে মর্যাদার আসনে সমাসীন করে রেখেছেন। মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুংকু আবদুল রহমান দেশের অর্থনীতির স্বার্থে মুসলিম দেশে ক্যাসিনো চালু করার অনুমতি দিয়েছেন। আর বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির পিতা; আমাদের সংগ্রাম, ঐক্য ও স্বপ্নের প্রতীক। তার প্রতীকী উপস্থিতিই পারে অগ্রযাত্রার পথে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সব অনাকাক্সিক্ষত বিতর্ক-বিসংবাদ অপসারণ করতে, ঐক্যের বাঁধন সুদৃঢ় করতে এবং উন্নয়নের পথ মসৃণ করতে।

সময়মতো উন্নত বাংলাদেশের উন্নয়ন ভিশন অর্জন করতে হলে এ দেশেও সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বমানের একাধিক ‘মরূদ্যান’ গড়ে তুলতে হবে, যেটা করতে উন্নত সভ্যতাগুলোর সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বর্তমানে সভ্যতার উৎকর্ষ অনেক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে; কিন্তু সেটার বিস্তার সর্বত্র সমান নয়। এ প্রসঙ্গে আমেরিকান-ক্যানাডিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখক উইলিয়াম গিবসনের বক্তব্য এই যে, ‘The future is already here - it’s just
not evenly distributed’ উন্নত জাতি-গোষ্ঠীর সহযোগিতা, তাদের পুঁজি ও প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, সেবাদান ব্যবস্থার চমৎকারিত্ব আকৃষ্ট করতে আমাদের মধ্যে বিরাজমান তৃতীয় বিশ্বের ন্যূনতাগুলোকে অপনোদন করতে হবে, নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও সহনশীলতা ও উদারতা দিয়ে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, ভিন্ন জীবনাচরণ, ভিন্ন মত ও দর্শনকে সম্মান করা শিখতে হবে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে হবে। কিন্তু আমরা হাঁটছি উল্টো পথে।

ভারতবর্ষের এককালের শাসকগোষ্ঠী মুসলিম সম্প্রদায় ইংরেজ আমলের প্রথমদিকে অভিমানে ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষা বর্জন করেছিল। তখন সমাজে তাদের পিছিয়ে পড়ার এটাই ছিল প্রধান কারণ। স্যার সৈয়দ আহম্মদ খান, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ প্রগতিশীল মুসলিম নেতাদের অক্লান্ত চেষ্টায় পিছিয়ে পড়া মুসলমান সম্প্রদায় তখন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পায়। কিন্তু তার পরও আমরা রাজনীতির পাঁকে পড়ে না বুঝতে পেরেছি নিজেদের উন্নয়ন-স্বার্থ, না উপলব্ধি করতে পেরেছি ইসলামের প্রকৃত নিষ্কর্ষ। তুরস্কের খেলাফত রক্ষা করার জন্য আমরা একসময় কংগ্রেসের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি; অনেকে গরুর মাংস ভক্ষণ স্থগিত রেখেছি। পরে যখন ইয়ং টার্করা নিজেরাই খেলাফত ভেঙে দিল, তখন ব্রিটিশ সিভিল সারভেন্ট জে. ডাব্লিউ হোড়ের কল্যাণে ভারতবাসী জানল যে ইসলামে এমন কোনো ধর্মানুশাসন নেই যে, তুরস্কের সুলতান সব সময়ই খলিফা হিসেবে থাকবেন; এটা শুধুই একটা প্রথা ছিল মাত্র।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু ১৯৫৬ সালে যখন সৌদি আরব সফর করেন, তখন সৌদিরা সম্পর্ক উন্নয়নে তাকে ‘শান্তির দূত’ সেøাগানে ভূষিত করেন। একে অনৈসলামিক আখ্যা দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান এর তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। একপর্যায়ে সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে পাকিস্তানি শাসক চক্রের হুঁশ ফিরে আসে। প্রকৃত জ্ঞানের অভাবেই যে এমনটা হয়, তা বলাই বাহুল্য।

এখন আমাদের সামনে প্রশ্ন হলো আমরা কি সামনে যাব, নাকি ইংরেজ আমলের মতো না বুঝে আবার পেছনে প্রত্যাবর্তন করব? এদের কাজ-কারবার দেখে আমাদের বিদ্রোহী কবি নজরুল অনেক আগেই লিখেছিলেন ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো বসে, বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’ আমরা বোধ হয় সেই অবস্থা থেকে এখনো খুব বেশি দূর এগোতে পারিনি। উন্নতি ও প্রগতির প্রশ্নে এই জাতীয় কূপম-ূকতার কাছে নতি স্বীকার করার প্রশ্নই আসে না। তবে আলোচনার মাধ্যমে যদি তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাতে ক্ষতির কিছু নেই; সেটা করে দেখাই যেতে পারে।

লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

rulhanpasha@gmail.com