একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের দিনগুলোতে নিজামুদ্দিন আহমেদ বিবিসি’র সাংবাদিক ছিলেন, একই সঙ্গে তিনি ইউপিআই (ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল)-এ প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করতেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যখন অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে, রাষ্ট্রকে অকার্যকর করার জন্য বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গনের প্রগতিশীল শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরই নির্মূল করার তালিকা প্রণয়ন করা হয়। বিবিসির ঢাকা প্রতিনিধি নিজামুদ্দিন আহমেদ সেই তালিকাভুক্তদের অন্যতম। ১২ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তিনি যখন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে বসেছেন, তখন তাকে তুলে নেওয়া হয়। আর খোঁজ মেলেনি।
১৪ ডিসেম্বর আবিষ্কৃত হয় রায়েরবাজার বধ্যভূমি। সেখানেও শনাক্ত করা যায়নি তাকে। ১৯৭১-এ বিবিসি লন্ডন ছিল বাঙালিদের ও বিশ্ববাসীর সবচেয়ে আস্থাভাজন গণমাধ্যম। সে সময় মার্ক টালি, উইলিয়াম ক্রলি, ইভান চার্লটন, রোনাল্ড রবসন, জন ওজম্যান, নিকোলস ক্যারল, অ্যান্ড্রু ওয়াকার, ব্যাসিল ক্লার্ক প্রমুখের সঙ্গে বিবিসির ইথার তরঙ্গে উচ্চারিত হতো নিজামুদ্দিন আহমেদের নাম। তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্মমতার বিবরণ বিভিন্ন নিউজ এজেন্সির মাধ্যমে পাঠাতেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ম্যাকব্রাউনকে তিনি গেরিলা ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাকে দুবার সামরিক আইন প্রশাসকের অফিসে ডেকে নেওয়া হয়েছে।
শহীদ নিজামুদ্দিন আহমেদের জন্ম মুন্সীগঞ্জে ১৯২৯ সালে, তিনি হরগঙ্গা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা করেন। তিনি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পাঠাতেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র উল্লেখ না করে তিনি কোনো সংবাদই পাঠাতেন না। বিবিসিতে তার পাঠানো তিনটি ডেসপাচ ভাষান্তর করা হলো।
১ ডিসেম্বর, ১৯৭১ : ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভারতীয় বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বাংশের জেলা সিলেটের শমসেরনগর এয়ারপোর্ট এবং পশ্চিম সীমান্তের দর্শনা রেলওয়ে স্টেশনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে। মুখপাত্র বলেন, এগোতে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ধোঁকা খেয়েছে। অপর একটি উৎস থেকে জানা গেছে, গুরুতর লড়াই এড়ানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় পাওয়া খবরে জানা গেছে, ভারতীয় বাহিনী এখনো লড়াই করে যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে বিদ্রোহীরা, সরকারিভাবে যারা দুষ্কৃতকারী হিসেবে পরিচিত, গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী শহরের বিভিন্ন অংশে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। বামপন্থিদের একটি রাজনৈতিক কার্যালয়েও একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে; ডানপন্থি নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছেন, অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানে একটি জাতীয় সরকার গঠিত হতে পারে। জুলফিকার আলি ভুট্টোকে এই সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। অধ্যাপক আযম দাবি জানিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য জাতীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিয়োগ করতে হবে।
রামপুরা ও মালিবাগে বোমা বিস্ফোরণে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় ও রহমতউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এতে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে পাকিস্তানি মোটর্সের কাছে একটি পেট্রলপাম্পে বোমা বিস্ফোরিত হওয়ায় পাম্পটির অনেক ক্ষতি হওয়াসহ দুজন মানুষও জখম হয়েছে। একজনের জখম গুরুতর। মিটফোর্ড হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, কেরানীগঞ্জের কাছে গুলিবিদ্ধ দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ নিয়ে গুলিতে জখম ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াল ৩৫-এ। এদিকে পাকিস্তান সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার এখনো শেষ হয়নি।
ঢাকা শহরে সরকার রেশন কার্ডের মাধ্যমে কেরোসিন তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি এখন একটি ন্যায্যমূল্যের দোকান দেখতে গেলাম, দেখলাম শত শত লোক দিনের কাজ ফেলে সেই ভোর থেকে মাথাপিছু এক গ্যালন কেরোসিন তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ভোক্তাদের মতে, গ্রামাঞ্চলে বস্তুত কেরোসিন তেল পাওয়াই যাচ্ছে না। স্থানীয় পত্রিকাগুলো সম্পাদকীয়তে এই কেরোসিন সমস্যার সমাধানে সরকারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। বাঙালি বিদ্রোহীরা চট্টগ্রামে তেলের ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তা ডুবিয়ে দেওয়ার পর থেকে কেরোসিনের সংকট দেখা দিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ মানুষ সন্ধ্যার পর বাতি জ্বালাতে কেরোসিন তেল ব্যবহার করে, শহরাঞ্চলে রান্নার চুলা জ্বালাতেও কেরোসিন তেলের ব্যবহার হয়ে থাকে।
৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ : ঢাকার আকাশে একদিনের বিমানযুদ্ধ ও ডগ ফাইটের পর গতকাল বিকেল থেকে আজানের সময় পর্যন্ত বিমানবন্দরে আর কোনো আক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। গত রাতে স্থানীয় সময় আড়াইটায় ভারতীয় বিমানবাহিনী ঢাকা শহরের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। ঢাকার শহরতলি থেকে আমিও বোমার শব্দ শুনতে পেয়েছি। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সূত্রেও জানা গেছে, ভারতীয় বাহিনীর রণাঙ্গন এখন কুমিল্লার আখাউড়া, ময়মনসিংহের কামালপুর এবং উত্তরাঞ্চলে দিনাজপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। সূত্র জানাচ্ছে, পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের সৈন্যদের আক্রমণ প্রতিহত করেছে।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সকাল-সন্ধ্যা কারফিউ জারি রয়েছে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট পালন অব্যাহত রাখা হয়েছে। ঢাকার সঙ্গে বাইরের এলাকাগুলোর সব ধরনের যোগাযোগ রহিত হয়েছে, স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্পূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভারতীয় বাহিনীর আকাশপথ ও স্থলপথে আক্রমণ অব্যাহত থাকায় দোকানপাট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং অন্যান্য দপ্তর বন্ধ রাখা হয়েছে। ঢাকা টেলিভিশন গত রাতের সংবাদে ঢাকা বিমান ঘাঁটিতে ভারতীয় আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ এবং আটক পাইলটকে দেখানো হয়েছে। যুদ্ধের বড় খবরসহ যথারীতি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ : চারদিকে অবরোধ এবং দেশে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পর দুষ্প্রাপ্যতা, উচ্চমূল্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বাজার থেকে সরে যাওয়ার খবর এসে পৌঁছেছে। কয়েকটি নির্ধারিত শহর ও জেলা সদর ছাড়া টেলিফোন যোগাযোগ আর কোথাও নেই। ঢাকা থেকে এবং ঢাকার উদ্দেশে সব ধরনের যান যোগাযোগ ও সেবা স্থগিত করা হয়েছে। শহরে ব্যক্তিমালিকানাধীন মোটর, বাস ও অন্যান্য গণ-পরিবহনকে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে না। তবে রাস্তায় সামরিক পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরের যানবাহন দেখা যাচ্ছে এবং এসব যানবাহনে সীমিত পরিমাণে জ্বালানি প্রদান করা হচ্ছে। লবণ, কেরোসিন তেল, সরিষার তেল ও পূর্ব পাকিস্তানে ব্যবহার্য অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র খোলাবাজার থেকে সরে গেছে। শহরের বাজারে মাছ ও মাংসের সরবরাহ অত্যন্ত কম। দোকানপাট ও অফিস স্থানীয় সময় বেলা ২টায় বন্ধ হয়ে যায়। উপর্যুপরি বিমান আক্রমণের কারণে ব্যাংকসেবা ও শিল্প-কারখানার কাজকর্ম দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, তবে সাধারণভাবে একই সঙ্গে মানুষ বিমানযুদ্ধও বেশ উপভোগ করছে। সংবাদপত্রের প্রচার মূলত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। সানডে টাইমসের বাংলাদেশ দরদী সাংবাদিক নিকোলাস টোমালিনের ভাষায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসররা যে ‘এলিটোসাইড’এলিটদের বাছাই করে হত্যাকান্ড চালিয়েছে, তা গণহত্যার চেয়েও ভয়াবহ।