পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করেও কোম্পানির উন্নয়ন না হওয়া, শেয়ার বিক্রি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শুনানিতে উপস্থিত না হওয়াসহ বিভিন্ন সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনে তালিকাভুক্ত তিন কোম্পানির ছয় পরিচালকের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শককে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে এসইসি। এছাড়াও দেশের সব বিমান ও স্থলবন্দরগুলোতেও চিঠি দিয়েছে কমিশন।
গত ৬ ডিসেম্বর এসইসির পরিচালক (এসআরএমআইসি) রিপন কুমার দেবনাথ স্বাক্ষরিত চিঠি পুলিশ, বিমান ও স্থলবন্দরগুলোতে প্রেরণ করা হয়েছে। চিঠিতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আজিমুল ইসলাম, ইমাম বাটনের এমডি মোহাম্মদ আলী, পরিচালক জেবুন্নেছা আক্তার, পরিচালক হামিদা বেগম, পরিচালক লোকমান চৌধুরী এবং ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের উদ্যোক্তা ও এমডি ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরীকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়েছে এসইসি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, উল্লিখিত ব্যক্তি পুঁজিবাজার থেকে বিভিন্ন সময়ে আইপিও, আরপিও এবং রাইট শেয়ার অফারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করেন এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে তাদের ধারণকৃত বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করেন। এতে কমিশনের বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন কর্তৃক তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসইসি বিভিন্ন সময়ে এসব ব্যক্তিকে কমিশনে উপস্থিতপূর্বক ব্যাখ্যা তলব করে। কিন্তু তারা কমিশনে উপস্থিত হননি অথবা ব্যাখ্যা প্রদানে অসমর্থ হন। তাছাড়া বিভিন্ন কারণে কমিশন মনে করে উল্লিখিত ব্যক্তিরা অচিরেই দেশত্যাগ করতে পারেন।
এ অবস্থায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য উল্লিখিত কোম্পানির পরিচালকদের সম্পর্কে এসইসি কর্তৃক পরবর্তী তথ্য প্রেরণ না করা পর্যন্ত তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা প্রদানের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ, বিমান ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে এসইসি।
এসইসি যে তিনটি কোম্পানির এমডি ও পরিচালকদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার অনুরোধ জানিয়েছে, এর মধ্যে দুটি কোম্পানিকে কমিশন বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার রাইট শেয়ার ইস্যু ও বিশেষ ব্যবস্থায় মূলধন বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু শত শত কোটি টাকা উত্তোলন করলেও কোম্পানির মৌলভিত্তিতে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। বরং নিজেদের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন।
১৯৯৭ সালে তালিকাভুক্ত আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে দুবার রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করলেও প্রতিষ্ঠানটির আয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। সর্বশেষ ২০১৮ সালে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ১০৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা পুঁজিবাজার থেকে উত্তোলন করে। কিন্তু দুবার সময় বাড়িয়েও কোম্পানিটি রাইট শেয়ারের অর্থ পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারেনি। এর আগে ২০১১ সালেও রাইট ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করেছিল কোম্পানিটি।
রাইট ইস্যু ছাড়াও প্রায় প্রতি বছর বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার মাধ্যমে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। যদিও পরিশোধিত মূলধনের তুলনায় কোম্পানির পণ্য বিক্রি থেকে আয় অনেক কম। বর্তমানে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন দাঁড়িয়েছে ২৫৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা। আর ২০১৯-২০ হিসাববছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের পণ্য বিক্রি থেকে আয় ছিল ৭২ কোটি টাকা। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৯ পয়সা। সিকিউরিটিজ আইনে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কোম্পানিটি এখনো ২০১৯-২০ হিসাববছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি। গত দুই বছর ধরেই কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমতে দেখা গেছে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার বিক্রি হচ্ছে ৬ টাকা ৬০ পয়সায়। একই গ্রুপের আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ নামে আরও একটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে।
পুঁজিবাজারে সবচেয়ে কমদামি শেয়ার হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকা ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের। এ কোম্পানির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার বিক্রি হচ্ছে মাত্র দেড় টাকায়। কোম্পানিটির প্রধান উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরী, যিনি ইংল্যান্ড প্রবাসী এবং বছরের বেশিরভাগ সময় সেখানেই থাকেন। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে কোম্পানির সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ।
২০১০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এভিয়েশন খাতের একমাত্র কোম্পানি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। আর তালিকাভুক্তির ছয় বছরের মধ্যে কোম্পানির সব উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড হয়ে যায়। তালিকাভুক্তির পর ২০১৫ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটি লভ্যাংশ দেয়, যার সবই বোনাস। তালিকাভুক্তির এক বছর পরই কোম্পানিটি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। পরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার মধ্যেই আরও উড়োজাহাজ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজকে ১৪ কোটি শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দেয় এসইসি। এসব শেয়ার তাসবিরুল আহমেদের মালিকানাধীন টিএসি এভিয়েশন ছাড়াও ফিনিক্স এয়ারক্রাফট লিজিং পিটিএস ও সুইফট এয়ার কার্গো পিটিএস সিঙ্গাপুরের নামে ইস্যু করা হয়। কিন্তু এসব শেয়ারের বিনিময়ে কোনো উড়োজাহাজ আসেনি। তবে এর আগে কোম্পানিটি অভিযোগ জানায় যে, বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে ওইসব উড়োজাহাজ আনতে পারেনি। ইউনাইটেড এয়ারের সব মিলিয়ে ১২টি উড়োজাহাজ দীর্ঘদিন ধরে গ্রাউন্ডেড হয়ে আছে। বর্তমানে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের মাত্র ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড গত ১০ বছর ধরেই লোকসানে। সর্বশেষ ২০১০ সালে কোম্পানিটি লভ্যাংশ দিয়েছিল। আর ২০১১ সাল থেকে ধারাবাহিক লোকসানে। পণ্য বিক্রি কমে যাওয়া ও লোকসানের কারণে চলতি বছর এর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অবশ্য লোকসানে থাকলেও স্বল্প মূলধনী এ কোম্পানির শেয়ার গতকাল ২৪ টাকা ৭০ পয়সায় কেনাবেচা হয়েছে।