রোহিঙ্গা স্থানান্তর নিয়ে সংসদীয় কমিটি

অনড় অবস্থানের জন্যই জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করা হয়নি

জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর ‘অবাস্তব শর্ত, নেতিবাচক প্রচারণা, অনড় অবস্থান ও অসহযোগিতার’ কারণে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় সংস্থাটিকে এ পর্যন্ত সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল মঙ্গলবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়।

জাতিসংঘসহ মানবিক সহায়তা প্রদানকারী অন্য দাতা দেশ এবং সংস্থাগুলোকে ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ ফারুক খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতিসংঘের দুই-তিন মাস আগে যে অবস্থান ছিল গত দু’দিনে এর পরিবর্তন হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কথা হলো জোরপূর্বক নেওয়া হলে তারা এখন বলে কেন তারা স্বেচ্ছায় গেছে এবং সেখানে ভালো আছে? এই সব কথার মূল উৎস হলো ওই ৩০৬ জন। ওইসব রোহিঙ্গা যখন গভীর সমুদ্রে মরার মতো অবস্থায় ছিল তখন কিন্তু জাতিসংঘ এগিয়ে আসেনি। এমনকি অন্য কোনো দেশকেও বলেনি। তারা শুধু টেলিফোনে বলেছে আপনারা উদ্ধার করেন। আমরা উদ্ধার করে ওই লোকদের ভাসানচরে নিয়ে রেখেছি। তিনি বলেন, আমরা আশা করি জাতিসংঘ কক্সবাজারের শরণার্থী কেন্দ্রগুলোর মতো সেখানেও তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করবে। কারণ, যারা ভাসানচরে গেছে তারা খুশি।

মন্ত্রণালয় থেকে বৈঠকে আরও জানানো হয়, ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের অন্যান্য মানবিক বিষয়ে সহায়তা দানের বিষয়ে এরই মধ্যে কক্সবাজারে কর্মরত ২২টি এনজিও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সাময়িকভাবে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি আবাসস্থল গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

গত ২ ডিসেম্বর জাতিসংঘ এক বিবৃতিতে বলেছে, কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে জাতিসংঘ অবগত আছে। কিন্তু শরণার্থীদের স্থানান্তর প্রস্তুতি কিংবা রোহিঙ্গাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংস্থাটিকে যুক্ত করা হয়নি। এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে জাতিসংঘের কাছে তথ্য খুবই কম আছে বলে জানানো হয়েছে ওই বিবৃতিতে। এরপর ৪ ডিসেম্বর মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেওয়া হয়। আর ভাসানচরে পৌঁছে অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এর আগে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় সাগর থেকে ৩০৬ জনকে উদ্ধার করে সেখানে রাখা হয়।

সংসদ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন ও তাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের উপস্থাপিত কর্মপরিকল্পনায় কমিটির পক্ষ থেকে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার সুপারিশ করে কমিটি।

সভাপতি ফারুক খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, মো. আব্দুল মজিদ খান, নাহিম রাজ্জাক এবং কাজী নাবিল আহমেদ অংশ নেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কূটনীতিকদের বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড দেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় : কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য পদক দিতে যাচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ বছর থেকেই দেওয়া হবে পদক। প্রতি বছর একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিককে ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ডিপ্লোম্যাটিক এক্সিলেন্স’ নামের এই পদক দেওয়া হবে। প্রথমবারের মতো এই পদক পেতে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম ইউনিটের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশীদ আলম এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাবেক রাষ্ট্রদূত সায়েদ মোহাম্মদ আল মুহারি। এ বছর বিজয় দিবসে এই পদক ঘোষণা করা হবে। জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে তা হস্তান্তর করা হবে।

গতকাল বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ ফারুক খান। তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতি বছর এই অ্যাওয়ার্ড দেবে। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য এটি দেওয়া হবে। বিদেশিদের ক্ষেত্রে দেখা হবে বাংলাদেশের জন্য তার অবদান কী। এখানে কাজ করার পর অ্যাওয়ার্ড দিলে পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে উৎসাহ পাবেন।’

ইউএইর সাবেক রাষ্ট্রদূতকে পদক দেওয়ার বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি বলেন, ‘তার সময়ে বাংলাদেশে তিনটি অর্থনৈতিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তার কর্মকালে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তিনবার সফর করেছেন। এখানে তার ভূমিকা ছিল।’ দুই ভরি সোনার একটি পদক এবং একটি সাইটেশন তাদের দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।