প্রণোদনা প্যাকেজ বিষয়ে মতবিনিময় সভায় বক্তারা

সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজীকরণ জরুরি

কিছু খাত এখনো অসচল। এ জন্য করোনা মোকাবিলায় সরকারকে আর্থিক সহায়তার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত বাস্তবায়ন পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, সহায়তার ক্ষেত্রে করোনার প্রথম ধাক্কার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় ওয়েভ মোকাবিলায় নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রম অনুযায়ী শ্রমিকদের জন্য যথেষ্ট সহযোগিতা ও ব্যবসায়ীদের অনুকূল পরিবেশ দিতে হবে। দেশের দরিদ্রতম অংশটা সহায়তার আওতায় আনাসহ সামাজিক সুরক্ষা খাতে আরও একটু বেশি নজর দিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষেত্রবিশেষ বর্ধিত করার পরামর্শ দেন তারা।

গতকাল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ আয়োজিত কভিড-১৯ মোকাবিলা ও টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজ বিষয়ে মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। কিনোট পেপার উপস্থাপন করেন অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুর রউফ তালুকদার। প্যানেল আলোচকদের মধ্যে বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সিনিয়র গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফিরদৌসি নাহার, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ড. সাজ্জাদ জহির, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার নিহাদ কবির, ইউরোপ ইউনিয়নের হেড অব ডেলকেশন ও রাষ্ট্রদূত রেনজে তেরিঙ্ক।

তাজুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাসে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনীতির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব দূর করে সমৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনতে শেখ হাসিনা ঘোষিত প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ বাস্তবায়ন এখনো চলছে। এসব প্রণোদনা সফলভাবে বাস্তবায়নের ফলে রপ্তানি, বেসরকারি ঋণপ্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইত্যাদি বৃদ্ধিসহ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিম্নমুখী রাখা সম্ভব হয়েছে।

ব্যারিস্টার নিহাদ কবির বলেন, জুন-জুলাইয়ে দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরে এসেছিল। কিন্তু তারপর করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ আসার পর নভেম্বর থেকে আমাদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ কিছু খাত এখনো সচল হয়ে ওঠেনি। তবে আশার কথা সরকার এসব ব্যাপারে তীক্ষè দৃষ্টি রাখছে। পাশাপাশি সময় অনুযায়ী দরকারি সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করছে না।

তিনি বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে  ঊর্ধ্বগতি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু নভেম্বরে সেটা নিম্নগতি দেখতে পাচ্ছি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও সংকট দেখা যাচ্ছে। অনেক খাতে দেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৯০ শতাংশ ব্যবসা সচল হয়েছিল। কিন্তু চাহিদা ও মূল্যের ক্ষেত্রে আমরা আগের অবস্থানে ফিরে আসতে পারিনি। আমার নিজের চাশিল্প খাতে দেখতে পাচ্ছি গত বছরের তুলনায় অত্যন্ত ৩০ শতাশং মূল্য ও চাহিদা কমেছে। গত বছরের প্রথমদিকের ক্ষতিটা কাটিয়ে উঠে সেই ক্ষতি পুষিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সময়, অনুকূল পরিবেশ ও দীর্ঘ সহায়তার প্রয়োজন।

ড. সাজ্জাদ জহির বলেন, করোনায় দেশের সবাইকে সহায়তার আওতায় আনতে পারিনি। কেন এই আর্থিক সহায়তা ১২০টি উপজেলায় সীমিত, সেটা নিয়ে আরও একটু ভাবা দরকার। পেনডামিক জাতীয় ঘটনাগুলোতে সবার প্রত্যাশা থাকে দেশের দরিদ্রতম অংশটাকে সহায়তার আওতায় আনা।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমরা দারিদ্র্যের যে সংজ্ঞা মেনে চলি, সেখানে মাথাপিছু আয় বিবেচনা করে ৩৩ শতাংশ দরিদ্র পেয়েছি, যারা সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসার যোগ্য কিন্তু কোনো কারণে সেখান থেকে তারা বাদ পড়েছে। আবার দেখা গেছে, যারা এই সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসার কথা না, তারা সেই সুবিধা পাচ্ছে। এর সংখ্যা হচ্ছে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এ জন্য আমাদের টার্গেটিং আরও ঠিক করতে হবে। টার্গেটিং ঠিক করা গেলে এর আওতা আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, ৪৯২টি উপজেলাকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। এর মধ্যে আমরা ৩০ শতাংশ সক্ষমতা অনুযায়ী কাভারেজ দিতে পেরেছি। এখন ১১২টি উপজেলায় শতভাগ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের লক্ষ্য ওপর থেকে যেভাবে নির্দেশ পাব, এতে আরও উপজেলা আসবে।

লিকেজের বিষয়ে তিনি বলেন, বড় বড় প্রোগ্রামে কিছু লিকেজ থাকতেই পারে। এটা আমরা অস্বীকার করব না; বিশেষ করে খাদ্য বিতরণে এ ধরনের ঘটনা বেশি হয়। কিন্তু আমরা যখন টাকা বিতরণ করলাম, তখন ৬০ লাখ লোকের নাম পেয়েছিলাম মাঠপর্যায় থেকে। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে ৩৭ লাখ লোককে আমরা আড়াই হাজার টাকা করে দিতে পেরেছিলাম। এখানে আমাদের লিকেজ শূন্য। আর করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ মোকাবিলায় কী করা হবে, সেটা নিয়ে আজকের আলোচনায় যে পরামর্শগুলো এলো তা বিবেচনা করে নতুন প্যাকেজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।