করোনাভাইরাস দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে যাচ্ছে। ভুক্তভোগী একটি বড় গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যারা সরাসরি করোনায় আক্রান্ত হয়েছে তারা শারীরিকভাবে যেমন বড় একটি ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছে, আর যারা সুস্থ হয়ে উঠেছে তাদের মধ্যে অনেকেরই বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরে। পাশাপাশি প্রচন্ড মানসিক চাপে অনেকের অবস্থাই নাকাল। সার্বিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ অনেকেরই কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিয়েছে। প্রথম দিকে করোনা নিয়ে আমরা অনেক সামাজিক ট্যাবু দেখেছি। আক্রান্ত অনেককেই একঘরে করার প্রবণতা ছিল। আবার অনেকেই ভয়ে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথা বাইরে প্রকাশ করতে চায়নি ও করেনি। তবে পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি পরিবর্তন হয়েছে। আমরা করোনার সঙ্গে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। অনেক ক্ষেত্রে এত বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছি যে, করোনার ঝুঁকিকে অগ্রাহ্য করার ভাব চলে আসছে।
করোনাকালে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি। যে পরিবর্তনগুলো আনতে হয়তো দশক লেগে যেতে পারত, তেমন অনেক কিছু হয়তো এই এক বছরেই অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এর মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা অন্যতম। সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এমনকি স্থানীয় পর্যায়ের জনগণও ধীরে ধীরে তথ্যপ্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। যদিও পুরোপুরি ডিজিটাল অগ্রগতি অর্জন করার জন্য এখনো অনেক কিছু বাকি। শহরাঞ্চলে করোনা অফিস সংস্কৃতিতে অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এখন অনেকেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ঘরে বসে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে। আবার অনেকেই আছে যারা আগে অফিসে বসে কাজ করত তাদের অনেকেই বাসায়, এমনকি ঢাকার বাইরে বসে অনলাইনে অফিস করছে। আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি অনলাইনে আদালত পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা অভাবনীয়। আমরা জানি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অনলাইন দুনিয়ায় যত তাড়াতাড়ি আমরা জাতি হিসেবে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারব তত তাড়াতাড়ি অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বিশেষত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে।
করোনাকালে বিশেষ করে লকডাউনকালীন সবাইকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে দেখেছি। দেখেছি কীভাবে সবাই আতঙ্ক ও অস্বস্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সিনিয়র সিটিজেনদের মধ্যে অনেকেই ঘরে থাকতে থাকতে একঘেয়েমির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছেন, আবার অনেকেরই ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে।
করোনা মানুষের চলাফেরা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বয়স্ক জনগোষ্ঠীসহ যুব জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখনো ঘরে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে। অনেকেই মনে করছে এই অবস্থা থেকে মুক্তি নেই। এমনিতেই আমাদের দেশের নাগরিকদের বিশেষত বয়স্কদের ও যুবদের আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ কম।
সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডসহ বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্র আগের থেকে অনেক সীমিত হয়েছে। করোনা এই অবস্থাকে আরও বেশি সংকুচিত করেছে। উল্টো যেটা হয়েছে অনেকেই অনলাইন সামাজিকমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা ও রক্ষণশীল উগ্রবাদী প্রচারণার শিকার হচ্ছে।
সংকট হচ্ছে ইতিমধ্যে করোনা নতুন প্রজন্মের মানসজগতে এক বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছে। নারীদের ক্ষেত্রে, বিশেষত কিশোরী ও যুবতীদের ক্ষেত্রে এই অবস্থা আরও বেশি সংকটপূর্ণ। করোনার আগে বাইরের জগতে কিশোরী ও যুবতীদের যারা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় যুক্ত ছিল করোনা তাদেরকে আবার ঘরের মধ্যে চালান করে দিয়েছে। অধিকন্তু এদের মধ্যে করোনাকালীন সময়ে যারা বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে চাচ্ছে তাদেরকে আবার পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে করোনাকালে অনেক যুবতী ও কিশোরী পারিবারিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কিন্তু পারছে না কাউকে বলতে, আবার না পারছে একটু বের হয়ে মুক্ত বাতাস গ্রহণ করতে। আবার অনেক কিশোর-কিশোরী অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটাতে গিয়ে অনলাইনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ‘অনলাইন বুলিয়িং’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে আর অন্যরা এর শিকার হচ্ছে।
অনেক শিশু যাদের এই বছরে স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা, ভর্তি হওয়ার পরপরই যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হলো, স্কুলের অভিজ্ঞতটাই তারা বুঝতে পারল না। অনেকের কাছেই স্কুল মানে মোবাইল বা ল্যাপটপ। সহপাঠীদের সঙ্গে খোলামেলা মেলামেশা নেই, মিথস্ক্রিয়া বন্ধ, ঘরের মধ্যে বন্দি, জীবন সম্পর্কে এক নতুন ধারণা তৈরি হচ্ছে তাদের মনোজগতে। ভবিষ্যতে যখন করোনা থাকবে না তখন এই অবস্থা থেকে কীভাবে একটি সুন্দর, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া যেতে পারে তা নিয়ে হয়তো প্রত্যেকটা পরিবার ও তাদের পিতা-মাতাকে এখন থেকেই ভাবতে হবে।
অন্যদিকে স্কুলের শিক্ষার্থীরা যারা দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস করে, তাদের শিক্ষাজীবন থেকে একটা বছর ঝরে যাচ্ছে। এদের অনেকেই আছে যারা স্কুল না থাকার কারণে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে লেখাপড়ার প্রতি এক ধরনের অনভ্যস্ততা তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব কতটুকু হবে তা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু যতটুকু খবর পাওয়া যাচ্ছে, এই গোষ্ঠীর মধ্যে কেউ কেউ বিশেষত কিশোরীরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়বে। এদের মধ্যে অনেকেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে শিশু অবস্থায় বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে, কিশোরদের মধ্যে অনেকেই পারিবারিক পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। করোনার এই সামগ্রিক অবস্থা ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে এমন একটি অবস্থা তৈরি করতে পারে যেখানে নতুন প্রজন্ম নিজেদের আরও বেশি অনিরাপদ ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মনে করতে পারে। যার প্রভাব পড়তে পারে সামাজিক সংহতি ও সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায়।
করোনাকালে আমরা সবাই অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা জানি। কীভাবে কর্মজীবী মানুষ তাদের কাজ হারিয়েছে বা তাদের আয় কমেছে। আয় কমার কারণে অনেক পরিবারই মৌলিক প্রয়োজনসমূহ মেটাতে পারছে না বা এক্ষেত্রে তাদের খরচ কমাতে হয়েছে। এই অবস্থা নিঃসন্দেহে তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিন্তু করোনার ক্ষতি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখা উচিত হবে না। আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে করোনার প্রভাবকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে যে পরিবর্তনসমূহ চলে এসেছে তার ইতিবাচক বিষয়গুলোকে যেমন ধরে রাখা দরকার, একই সঙ্গে যে সংকটগুলো আমাদের সমাজব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও প্রকট হতে পারে তা মোকাবিলা করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবারই ভূমিকা আছে এবং সবারই সচেতন থাকা দরকার।
লেখক : উন্নয়নকর্মী
psmiraz@yahoo.com