১৯৬৯ থেকে ১৯৭১-এর ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেজর সিদ্দিক সালিক ঢাকাতেই ছিলেন সেনা দপ্তরের গণসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে। যে উড়োজাহাজে যুদ্ধবন্দি হিসেবে জেনারেল নিয়াজিকে ভারতে নেওয়া হয়, তারই একজন আরোহী মেজর সালিক। তিনি আত্মসমর্পণ ও ঢাকার পতনের নির্ভরযোগ্য একজন সাক্ষী। সেনাবাহিনীতে প্রকাশনা-সংক্রান্ত কঠোর বিধিবিধান থাকার পরও লেফটেন্যান্ট কর্নেল অবস্থায় তার উইটনেস ‘টু সারেন্ডার’ উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়। তারই সাক্ষ্য :
সামান্য জখম নিয়ে চাঁদপুর থেকে পালিয়ে আসা মেজর জেনারেল রহিম প্রাথমিক চিকিৎসার পর জেনারেল ফরমানের বাসায় রীতিমতো কাঁপছিলেন। তিনি দিকে ছুটলেন
বাসার একটি নির্জন অংশে শুয়েছিলেন। ফরমান তখন তার সঙ্গে। তারিখটা ১২ ডিসেম্বর (১৯৭১), ভারত-পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধের তখন নবম দিন চলছে। স্বাভাবিকভাবে তাদের মনোযোগ দিনের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ বিষয়টির ওপর ঢাকা কি প্রতিরোধ করে টিকে থাকতে পারবে? তারা খোলামেলা মতামত ব্যক্ত করছিলেন। রহিম বেশ বুঝতে পেরেছেন অস্ত্রবিরতিই হচ্ছে একমাত্র জবাব।
যে রহিম বরাবরই ভারতের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও হারজিতের যুদ্ধের পক্ষে ওকালতি করেছেন, তার মুখে অস্ত্রবিরতির পরামর্শ শুনে ফরমান অবাক হলেন। খানিকটা ব্যঙ্গাত্মক স্বরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত তাড়াতাড়ি তুমি তোমার সাহস হারিয়ে ফেলেছ?’ রহিম জোর দিয়ে বললেন, ‘আসলে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।’
এ আলাপের সময় ‘আহত জেনারেল’কে দেখতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি ও মেজর জেনারেল জামশেদ সেই কক্ষে প্রবেশ করলেন। রহিম তার পরামর্শের পুনরাবৃত্তি করলেন কিন্তু নিয়াজি এতে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন না। তখন পর্যন্ত বিদেশি সাহায্যের সম্ভাবনার আলো একেবারে নিভে যায়নি। বিষয়টিকে এড়িয়ে ফরমান এর পাশের সংযুক্ত কক্ষে ঢুকে পড়লেন।
রহিমের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে জেনারেল নিয়াজি ফরমানের কক্ষে গেলেন এবং বললেন, ‘তাহলে রাওয়ালপিন্ডিতে সিগন্যাল পাঠিয়ে দাও।’
এতে মনে হলো তিনি জেনারেল রহিমের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন, যেমনটা তিনি সবসময় শান্তিকালীন সময়ে করতেন। জেনারেল নিয়াজি চাইলেন অস্ত্রবিরতির প্রস্তাবটি গভর্নর হাউজ থেকে প্রেসিডেন্টের কাছে যাক। ফরমান বিনয়ের সঙ্গে বললেন, এই সিগন্যাল ইন্টার্ন কমান্ড সদর দপ্তর থেকে যাওয়া উচিত। কিন্তু জেনারেল নিয়াজি জোরাজুরি করে বললেন, ‘সিগন্যাল এখান থেকে যাক বা ওখান থেকে যাক, তাতে তেমন কিছু এসে যায় না। আসলে আমার জরুরি কিছু কাজ আছে, সিগন্যালটা এখান থেকে পাঠিয়ে দাও।’
ফরমান ‘না’ বলার আগেই চিফ সেক্রেটারি মুজাফফর হোসেইন কক্ষে প্রবেশ করলেন, আলোচনার যেটুকু তার কানে ঢুকেছে, তার ওপর ভিত্তি করে নিয়াজিকে বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, এখান থেকে সিগন্যাল পাঠানো যেতে পারে।’
তাতে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটল। জেনারেল ফরমান যখন বিরোধিতা করলেন, তা কিন্তু অস্ত্রবিরতি প্রস্তাবের বিরোধিতা নয়; প্রস্তাব পাঠানোর দায়িত্বের প্রশ্নে তিনি বিরোধিতা করেছেন। একই বিষয়ে তার আগের পাঠানো সিগন্যাল রাওয়ালপিন্ডি প্রত্যাখ্যান করেছে। একবার মার খেলে তো দ্বিতীয়বার তার না-ই বলার কথা।
‘জরুরি কাজ’-এর দোহাই নিয়ে নিয়াজি বেরিয়ে গেলেন আর মোজাফফর হোসেইন ঐতিহাসিক নোটটি লিখলেন। এটা ফরমান দেখে গভর্নরের কাছে পেশ করলে গভর্নর তা অনুমোদন করলেন এবং সেদিন (১২ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় তা প্রেসিডেন্টকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। এই নোটে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে জোর আর্জি পেশ করা হয়েছে, তিনি যেন নিষ্পাপ মানুষগুলোর জীবন রক্ষার জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করেন।
পরদিন গভর্নর ও তার প্রধান সহকারী রাওয়ালপিন্ডি থেকে আদেশ পাওয়ার অপেক্ষায় রইলেন, কিন্তু মনে হলো প্রেসিডেন্ট এতই ব্যস্ত যে, এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তার পরদিন (১৪ ডিসেম্বর) একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত ছিল, তিনটি ভারতীয় মিগ বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে গভর্নমেন্ট হাউজ আক্রমণ করল এবং প্রধান হলরুমের একাংশের ভারী ছাদ উড়িয়ে দিল। গভর্নর বিমান আক্রমণকালীন আশ্রয় ট্রেঞ্চের দিকে ছুটলেন এবং নিজের পদত্যাগপত্র লিখলেন। অ্যাকুয়ারিয়ামের কয়েকটি মাছ ছাড়া ক্ষমতাসনে বসা সবাই বিমান আক্রমণের মুখে প্রাণে বেঁচে গেলেন। মাছগুলো গরম পাথরের ওপর পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
১৪ ডিসেম্বর (১৯৭০) পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর তার ক্যাবিনেট এবং পশ্চিম পাকিস্তানি সিভিল সার্ভেন্টরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে চলে এলেন। রেড ক্রিসেন্ট এটিকে ‘নিরপেক্ষ জোন’ ঘোষণা করেছে। পশ্চিম পাকিস্তানি ভিআইপিদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল, ঢাকা বিভাগের কমিশনার, প্রাদেশিক সচিব এবং আরও কজন। নিরপেক্ষ জোনের প্রবেশাধিকার লাভের জন্য তারা লিখিতভাবে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেছে, কারণ যুধ্যমান পক্ষের কারও রেড ক্রসের সুরক্ষা পাওয়ার প্রাধিকার নেই।
১৪ ডিসেম্বর ছিল পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শেষ দিন। সরকার ও গভর্নমেন্ট হাউজের ধ্বংসাবশেষ চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো। শত্রুদের শুধু জেনারেল নিয়াজিকে এবং তার অধীন ট্রুপসকে নিরস্ত্র করতে পারলে বাংলাদেশের ‘সিজারিয়ান বার্থ’ সম্পন্ন হবে। ততক্ষণে জেনারেল নিয়াজি বুঝতে পেরেছেন, বিদেশি সাহায্যের আর আশা নেই। তিনি আগের হতাশায় ডুবে গেলেন, কদাচিৎ তিনি তার সজ্জিত কেবিন থেকে বেরিয়েছেন। দিক ও গতির কোনো নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে না নিয়ে তিনি সময়ের রথে চড়েন।
আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি চূডান্ত হলো। মেজর জেনারেল জ্যাকব তার সঙ্গে আত্মসমর্পণ দলিল নিয়ে এসেছেন জেনারেল নিয়াজি এবং তার চিফ অব স্টাফ এটাকে বলতে চাচ্ছেন খসড়া অস্ত্রবিরতি চুক্তি। জ্যাকব কাগজপত্র বাকারের হাতে অর্পণ করলেন। বাকার এগুলো দিলেন মেজর জেনারেল ফরমানকে। এতে যেখানে ‘জয়েন্ট কমান্ড অব ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ’ বলা আছে, ফরমান তাতে আপত্তি জানালেন। জ্যাকব বললেন, কিন্তু এভাবেই দিল্লি থেকে তৈরি হয়ে এসেছে। ফরমান বললেন, এটা কবুল করবেন না প্রত্যাখ্যান করবেন, তা কামান্ডারের এখতিয়ার। নিয়াজি কিছুই বললেন না এ নীরবতাই তার সম্মতি বলে ধরে নেওয়া হলো। বিকেলের আগেই জেনারেল নিয়াজি ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে অভ্যর্থনা জানাতে এয়ারপোর্ট চলে এলেন। চিৎকার ও সেøাগানের মধ্য দিয়ে তারা রমনা রেসকোর্সের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে রওনা হলেন, সেখানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের মঞ্চ ঠিক করা আছে। পুরো মাঠজুড়ে আবেগপ্রবণ বাঙালির উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ছে। তারা পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলের প্রকাশ্যে অপদস্থ হওয়ার সাক্ষী থাকতে আগ্রহী।
বিজয়ীকে গার্ড অব অনার প্রদানের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে, পরাজিতের জন্য ভারতীয় সৈন্যদের একটি দল। আত্মসমর্পণ দলিলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ এবং কুড়ি কুড়ি বিদেশি সাংবাদিকের চোখের সামনে সই করলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি। তারা দুজন উঠে দাঁড়ালেন এবং নিয়াজি নিজের রিভলবার বের করলেন। ঢাকার আত্মসমর্পণে প্রতীক হিসেবে তা অরোরাকে প্রদান করলেন। এভাবে পূর্ব পাকিস্তান হস্তান্তরিত হয়ে গেল।