একাত্তরের ডিসেম্বরের প্র্রতিবেদন জ্যাক এন্ডারসনকে এনে দিয়েছে সাংবাদিকতার জন্য পুলিৎজার পুরস্কার। ইউনাইটেড ফিচার সিন্ডিকেটের প্র্রতিবেদক ও কলাম লেখক জ্যাক এন্ডারসনের যে প্র্রতিবেদনগুলো বিবেচনায় আনা হয়েছে, সেগুলো মূলত ১৯৭১-এর ডিসেম্বর যুদ্ধ নিয়ে, যার পরিণতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
জ্যাক নর্থম্যান এন্ডারসন (১৯ অক্টোবর ১৯২২-৭ ডিসেম্বর ২০০৫) অনুসন্ধানী-প্র্রতিবেদকদের গুরু। অনেক ঘটনার ব্রেকিং নিউজ তার হাতেই তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও সিআইএ প্রধান তাকে খুব অপছন্দ করতেন। তিনি ছয়টি ফিকশন সাতটি নন-ফিকশন গ্রন্থেরও প্র্রণেতা। এক পর্যায়ে তার প্র্রতিবেদন ও কলাম প্র্রায় এক হাজার সংবাদপত্রে ছাপা হতো। প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং ওয়াটারগেট বার্গলার গর্ডন লিভি তাকে খুন করতে চেয়েছেন। জ্যাক এন্ডারসনের সাড়া জাগানো ডিসেম্বর প্র্রতিবেদনের কয়েকটি অনূদিত হলো।
১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১
বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রণতরী
বঙ্গোপসাগরে সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তির মুখোমুখি হওয়ার পরিণতি হবে ভয়ংকর। ভারতকে নিরস্ত্র করার জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সন নৌ টাস্কফোর্সকে ঝামেলার দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
বিমানবাহী জলযান এন্টারপ্র্রাইজ বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছে, সঙ্গে আছে উভচর যান ত্রিপোলি, গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট কিং, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার তিনটিপার্সন, ডেকাটুর এবং টার্টার স্যাম।
একইসঙ্গে স্পষ্টতই ভারতকে সাহায্য করার জন্য বঙ্গোপসাগরের দিকে সোভিয়েত যুদ্ধজাহাজকে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। গোয়েন্দা প্র্রতিবেদন থেকে আরও অমঙ্গলজনক খবর পাওয়া গেছেভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজে সোভিয়েত টেকনিশিয়ান রয়েছে, সে জাহাজ পাকিস্তানি বন্দর এবং সংলগ্ন স্থাপনার ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজও আক্রান্ত হয়েছে, সমুদ্রতল থেকে উৎক্ষিপ্ত রকেটও শনাক্ত হয়েছে। সোভিয়েত সাবমেরিন থেকে রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছে কি না তা জানতে যুক্তরাষ্ট্র আশু সাহায্য চেয়েছে।
এদিকে হোয়াইট হাউজের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পক্ষপাত লুকোবার আর কোনো চেষ্টা করা হচ্ছে না। পাকিস্তানের ‘ডাইনামিক’ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ নামে পরিচিত তার সংকটকালীন সহায়তা দলকে সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পাকিস্তানকে সাহায্য করার পথ বের করতে তিনি বলেছেন। প্র্রেসিডেন্টের নীতিনির্ধারক হেনরি কিসিঞ্জার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হোয়াইট হাউজের গল্পকথার গোপন ‘সিচুয়েশন রুমে’ প্র্রায় প্র্রতিদিনই সভা করছেন।
নিক্সনের গোপন ক্রোধ
৩ ডিসেম্বর বৈঠকে বিরক্তিভরে কিসিঞ্জার বললেন, প্র্রতি আধঘণ্টা পরপর প্রেসিডেন্ট একবার করে আমাকে এক হাত নিচ্ছেন যে, আমরা ভারতের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোর ভূমিকা পালন করছি না।
কিছুক্ষণ আগেও তিনি আমাকে আবার সে কথা বলেছেন। আমরা তার ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ করছিএটা তিনি বিশ্বাস করছেন না। তিনি চান আমরা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ি। তিনি মনে করেন আমরা যা করতে চাই ঠিক তার উল্টোটাই ঘটছে।
জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল টমাস মুরার বৈঠকে সামরিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সিআইএর প্র্রতিনিধির পাঠানো প্র্রতিবেদন তুলে ধরেন সিআইএ প্রধান রিচার্ড হেল্মস। তারপর কিসিঞ্জার জাতিসংঘের বিষয় উপস্থাপন করেন। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ যদি কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারে, তাহলে বুঝতে হবে এর উপযোগিতা ফুরিয়ে গেছে, কাজেই মধ্যপ্র্রাচ্যে জাতিসংঘ যে গ্যারান্টি দিচ্ছে তা নিয়ে চিন্তা করা অর্থহীন।
অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট জোসেফ সিসকো বলেন, ‘আজ বিকেলে’ আমরা সুপারিশমালা পেশ করতে পারব। কিসিঞ্জার জোর দিয়ে বললেন, আমাদের অ্যাকশনে যেতে হবে। প্রেসিডেন্ট আমাকে দোষারোপ করছেন আর আপনারা হাত-পা ঝেড়ে বসে আছেন।
রাষ্ট্রদূত বুশ জাতিসংঘে যে বিবৃতি দেবেন তার খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়, কিসিঞ্জার বলেন, এটা তো দুদিক সামলে নিয়ে তৈরি করা বিবৃতি; ভারতের প্র্রশ্নে আমাদের কঠোর হতে হবে।
সিসকো বললেন, একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য আমরা ভারতের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারি, সেক্ষেত্রে এটাও ঘোষণা দিতে হবে পাকিস্তানের ব্যাপারে অনুরূপ পদক্ষেপ বিবেচনাধীন।
এই কথা শুনে গুমরে উঠে কিসিঞ্জার বললেন, ভারতীয় পদক্ষেপের সঙ্গে পাকিস্তানি পদক্ষেপ মেলাতে হলে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়া খুব কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্র খুব নমনীয়?
পর দিন ৪ ডিসেম্বরের বৈঠকে কিসিঞ্জার বললেন, আমাদের মুখপাত্ররা ভারত নিয়ে যা বলেছেন তাতে প্রেসিডেন্ট তো রাগে ফুঁসে উঠছেন।
কিসিঞ্জার বললেন, প্রেসিডেন্ট একটা মোহগ্রস্ততার মধ্যে আছেন, তিনি মনে করছেন যে তিনি নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন, আসলে কী ঘটছে কেবল তাই আমরা তাকে জানাচ্ছি।
নিক্সন এর মধ্যেই বেশ ক’টি গোপন জরুরি আপিল নাকচ করে দিয়েছেন। এর মধ্যে নয়াদিল্লিতে কর্মরত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের অনুরোধ ছিল ভারতকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্র্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক হতে হবে।
তিনি জানিয়েছেন যে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ সিং তাকে আশ্বস্ত করেছেন তাদের হাতে দখলকৃত বাংলাদেশকে ভারতের অংশ হিসেবে যোগ করার কোনো ইচ্ছে তাদের নেই। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে জনগণ স্বাগত জানাবে, যদি বাংলাদেশ নিজেদের প্র্রশাসন চালাতে সমর্থ হয়, তাহলে ভারতের কোনো প্র্রশাসক পাঠানোর ইচ্ছেও নেই।
ভারত-পাকিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে হোয়াইট হাউজের মনগড়া এক প্র্রতিবেদনের প্র্রতিবাদ জানিয়ে তিনি একটি গোপন বার্তা পাঠান। তিনি বলেন, যেহেতু এই ট্র্যাজেডির প্র্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে, হোয়াইট হাউজের প্র্রতিবেদনে যা লিখা হয়েছে তা আমি বিশ্বাস করি না, তা আমাদের অবস্থান কিংবা বিশ্বাসযোগ্যতাকে কোনোভাবেই দৃঢ় করবে না।
রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে চীনকে কমিউনিস্টদের কাছে হারাবার জন্য নিক্সন যেমন ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করেন, এটাই হবে নিয়তির পরিহাস যে ভারতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাড়িয়ে রাখা দুহাতে তুলে দেওয়ার জন্য দায়ী হবেন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন।
কিসিঞ্জার (প্র্রেসিডেন্টের প্রধান বিদেশ নীতিমালা প্র্রণেতা) বলেন, ভারত যদি সশস্ত্র স্থলবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে, তাহলে পাকিস্তানকে ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে পারে। দুটো বাহিনী অপসারিত হলে পাকিস্তানের আর প্র্রতিরক্ষা শক্তি থাকবে না। তাহলে পশ্চিম পাকিস্তান একটি মক্কেল রাষ্ট্রে (ক্লায়েন্ট স্টেট) পরিণত হবে। এই সম্ভাবনা অনেক প্র্রশ্নের সৃষ্টি করে, আমরা কী আমাদের একটি মিত্র রাষ্ট্রকে এভাবে সম্পূর্ণরূপে তলিয়ে যেতে দিতে পারি? ভারত এভাবে আমাদের ভয় দেখাবেএটা কি মেনে নিতে পারি?
মিস্টার সিসকো (এশীয়াবিষয়ক অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি ইনচার্জ) বললেন, ডক্টর কিসিঞ্জার যেদিকে ইঙ্গিত করলেন, সে রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হলে, পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ব্যাপারটা ভয়াবহ ঝুঁকির। তবে এটাই ভারতের লক্ষ্য কি না তা নিয়ে সিসকোর সন্দেহ আছে।
ড. কিসিঞ্জার বললেন, আমরা হয়তো এমন একটি পরিস্থিতির সাক্ষী থাকব যেখানে সশস্ত্র একটি দেশ (ভারত) সোভিয়েতদের সহায়তা নিয়ে পাকিস্তানের অর্ধেকটাকে বানাবে একটি নিবীর্য দেশ আর অন্যটাকে আজ্ঞাবহ ভ্যাসাল স্টেট। কিন্তু ততদিনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, অভ্যুদয় ঘটতে যাচ্ছে নতুন একটি স্বাধীন দেশের।