পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন

আওয়ামী লীগের কেন্দ্র ও তৃণমূলে সমন্বয় নেই

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া-নেওয়া নিয়ে সমন্বয় নেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্র আর তৃণমূলে। গত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে যেসব নেতা নির্বাচনে অংশ নেন সেসব নেতাকে এবার মনোনয়ন না দেওয়ার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আরেকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল যুদ্ধাপরাধী, আলবদর রাজাকারের বংশধর, স্বজন কাউকেই মনোনয়ন দেবে না আওয়ামী লীগ। এ দুটি সিদ্ধান্তের একটি ভেঙেছে কেন্দ্র অপরটি ভেঙেছে তৃণমূল আওয়ামী লীগ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে সমন্বয়হীনতার নজির পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি কুড়িগ্রাম পৌরসভায় কাজীউল ইসলামকে আওয়ামী লীগ চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়। স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দাবি নৌকা প্রতীক পাওয়া কাজীউল ইসলাম রাজাকারের বংশধর হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কাছে প্রতিষ্ঠিত। আর তাকেই কুড়িগ্রাম পৌরসভায় কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কুড়িগ্রামে দলীয় নেতারা বিক্ষোভ, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করলেও কেন্দ্র থেকে অবস্থান পাল্টানো হয়নি। একসময় কাজীউল ইসলাম বাসদ করতেন। বাসদের সমর্থনে ১৯৯৩ সালে পৌর মেয়রও হন তিনি।

পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান সাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে মনোনীত পৌর মেয়র প্রার্থী কাজীউল ইসলাম রাজাকারের পুত্র। এই এলাকার সবাই তা জানে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ নীতিগত অবস্থান নিয়েছে দুই ধরনের অভিযোগে যুক্ত কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এর একটি অতীতে নৌকার বিরোধিতা করে নির্বাচন করেছে কি না কোনো মনোনয়নপ্রত্যাশী, অন্যটি হলো যুদ্ধাপরাধী রাজাকারের বংশধরদের কেউ ঢুকে পড়ে কি না সেটা দেখা। তাহলে কুড়িগ্রামে পৌর মেয়র প্রার্থী কাজীউল ইসলামকে কেন মনোনয়ন দেওয়া হলো এ প্রশ্নের জবাবে নাছিম বলেন, উনি যুদ্ধাপরাধী পরিবারের এমন কোনো প্রমাণ কি রয়েছে? উনার পরিবারের কেউ কি ইতিমধ্যে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন? সর্বশেষ রাজাকারের তালিকায় তার পরিবারে কারও নাম আছে কি না? তিনি বলেন, কেউ একটা অভিযোগ করে ফেলল অমনি ওই প্রার্থী রাজাকারের বংশধর হয়ে যেতে পারে না। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কেউ হাজির করতে পারলে নির্বাচনের আগের দিনও ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হব আমরা।

এদিকে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবু তাহেরপুত্র সালাহউদ্দীন টিপু গত উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। এবার তৃণমূল আওয়ামী লীগ তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে টিপুকে বাদ দিয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী ১০ জনের নাম পাঠায়। তাহের পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্যে লক্ষ্মীপুর আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ। এবার লক্ষ্মীপুর আওয়ামী লীগ একাট্টা হয়ে ওই পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। লক্ষ্মীপুর আওয়ামী লীগ তাহের পরিবারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রে একাধিক লিখিত অভিযোগ পাঠায়। সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের আবু তাহের এসপি অফিসে জেলার সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকুকে মারধরের চেষ্টা করেন। দলীয় নেতারা জানান, পিংকু নিজে কেন্দ্রে এ ঘটনা তুলে ধরেন।

একই জেলার রায়পুর পৌরসভায় পৌর মেয়র পদে স্থানীয় আওয়ামী লীগ রফিকুল হায়দার পাঠানসহ (বাবুল) চারজনের নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে পাঠায়। এই পাঠান ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হারুনুর রশীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে মামলা করেন। ২০১০ সালের পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হন। অথচ তাকেই তৃণমূল আওয়ামী লীগ এক নাম্বারে রেখে কেন্দ্রে নাম পাঠায়। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে তৃণমূলের সমন্বহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সমন্বহীনতা নিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলার সভাপতি মিয়া গোলাম ফারুক পিংকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাবুল পাঠান বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নিবাচন করেছে অনেক আগে। সে সময় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিদ্রোহী কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না এটা নতুন সিদ্ধান্ত। আগের বিষয়টি আমরা ভুলে গেছি। তিনি বলেন, আমরা তৃণমূল থেকে নাম পাঠিয়েছি। এখন কেন্দ্র বিবেচনা করবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৃণমূল থেকে প্রস্তাবিত নাম আসা মানেই ওই প্রার্থীর মনোনয়ন পেয়ে যাওয়া নয়। তিনি বলেন, বিদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত ও রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী বা এদের বংশধর কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।