হতে পারে ব্যাপারটা নেহাতই কাকতালীয়। এও হতেই পারে যে সব দেশেই আমাদের মতো কিছু সন্দেহবাতিক লোক থাকে যারা খুঁজে খুঁজে সরকারের সব কাজের পেছনে কোনো না কোনো মতলবের গন্ধ পান। সে আপনি যাই ভাবুন বা বলুন না কেন লোকচক্ষুর আড়ালে কার নির্দেশে কৃষি বিল পাসের চার মাস আগে আদানি শিল্প গোষ্ঠী বিপুল এক গোডাউন করার অনুমতি পেল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
৭ মে। দেশে তখন কড়া লকডাউন চলছে। করোনা ভয়ে আতঙ্কিত গোটা দেশ। স্কুল কলেজ কারখানা সব বন্ধ। তার মধ্যে অত্যন্ত গোপনে, প্রবল তৎপরতায় হরিয়ানা সরকারের টাউন ও কান্ট্রি প্ল্যানিং দপ্তরের অনুমতি পৌঁছে গেল আদানি শিল্প গোষ্ঠীর এগ্রি লজিস্টিকসের কাছে। সে অনুমতি আর কিছুই নয়, মাত্র কিছু দিন আগে আদানি গোষ্ঠী হরিয়ানা সরকারের কাছে আবেদন করেছিল যে ৯০ হাজার, ০১৫ বর্গমিটার জমিতে তারা একটি বিশাল গোডাউন করতে চায়। কৃষি ও কৃষিজাত বিষয় মজুদ করার জন্য। মাননীয় সরকার বাহাদুর যেন তাদের এই সামান্য চাওয়াটুকু, অতি তুচ্ছ এই আবদারটুকু মেনে নেন। চাওয়া মাত্র সরকার সেই ছোট্ট আবদারটুকু মেনে তড়িঘড়ি লকডাউনের সময়েও অনুমতিপত্র কালবিলম্ব না করে পৌঁছে দিলেন আদানি শিল্প গোষ্ঠীর হাতে।
মনে রাখবেন তখনো কৃষি বিল আসতে ঢের দেরি। কোথাও কোনো আলোচনা নেই যে দেশের কৃষিতে বিপুল পরিবর্তন আনতে চায় সরকার। মোট কথা ঝড় আসতে চলেছে তার কোনো সামান্য ইঙ্গিতটুকুও নেই। বলছি বটে নেই কিন্তু সত্যিই কি ছিল না!! আদানি যেদিন অনুমতিপত্র পেলেন তার ঠিক এক মাস বাদে ৫ জুন কেন্দ্রীয় সরকার তিন তিনটে অর্ডিন্যান্স এনে দেশের কৃষি কাঠামোকে পুরোপুরি বাজারমুখী করপোরেট নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দিতে উদ্যোগী হলো।
এই বিলের একাধিক বিষয় থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিকের একটি হচ্ছে কৃষক যে ফসল উৎপন্ন করবে তা বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ভূমিকা থাকবে না। সে সরাসরি যে কোনো ব্যবসায়ীকে বেচতে পারবে। মা-ি নির্ভরতা কমবে। এটি অনেকের কাছেই যথেষ্ট প্রগতিশীল মনে হতে পারে। ফড়ে-দালাল-মিডলম্যানের হাত থেকে এ নাকি কৃষকদের মুক্তি দেবে। এই ধারার পেছনে বেশ কিছু উপধারা আছে, যা খুব খুঁটিয়ে না দেখলে বোঝা যাবে না যে গোটা প্রক্রিয়া কীভাবে নব্য পুঁজির হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে বেশি দাম দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নিজের পছন্দমতো ফসল ফলাবার নিদান দিতে পারে চাষিদের।
মা-ি প্রথা তুলে দিয়ে পুরো ব্যবস্থা করপোরেট পুঁজির কাছে ছেড়ে দিলে আগামী দিনে খাদ্য বৈচিত্র্য নিয়েও সমস্যা হবে। মুনাফার স্বার্থে সারা দেশে ধানের বদলে বজরা বা গম উৎপাদনের নির্দেশ দিল বৃহৎ শিল্পপতিরা। কৃষক সে নির্দেশ মানতে বাধ্য। কারণ নতুন আইনে বলা আছে কৃষক শিল্পপতি মন কষাকষি হলে কৃষকদের কোর্টে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ উঠে যাচ্ছে। ফলে নতুন এক বৃহৎ মজুদদার গোষ্ঠী জন্ম নেবে। ধরেও যদি নিই যে তারা কৃষকদের এখনকার চেয়ে বেশি দাম দেবে উৎপন্ন ফসলের জন্য, কিন্তু তারা সমস্ত খাদ্যশস্য মজুদ করে আগামী দিনে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এমনিতেই ভারতের অর্থনীতি এখন মাত্র কয়েকটি পরিবারের হাতে চলে গেছে। সরকার ধীরে ধীরে এদেশের রেশন ব্যবস্থাও তুলে দিতে চাইছে। ফলে এটা পরিষ্কার যে আগামী দিনে করপোরেট পুঁজিই দেশের কৃষিব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করবে। ঠিক এই জায়গা থেকেই করোনাকালেও চুপিচুপি আদানিকে এক বিপুল শস্যভান্ডার গড়ে তোলার অনুমতি কেন দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন ও সন্দেহ হবেই।
মুশকিল হচ্ছে যা যা আইনকানুন সংশোধন সবই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মোদি সরকার করে রাতের অন্ধকারে। অত্যন্ত গোপনে। সে কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বিলোপই হোক আর এই কৃষি আইনের সংশোধনী। ভুল বললাম বোধহয়। প্রকাশ্যে মোদি সরকার এক কলমের খোঁচায় সিলিন্ডার-পিছু পঞ্চাশ টাকা দাম বাড়াতে দ্বিধা করে না। কোনো ছেলেমেয়ে কাকে ভালোবেসে বিয়ে করবে, সে ভিন ধর্মের হলে তাকে জেলে পোরার আইন আনতে বুক ফুলিয়ে তর্জন-গর্জন করতে আমাদের মাননীয় সরকারের কোনো সমস্যা নেই। কে গরু খাবে না মুরগি খাবে তা নিয়ে সরকারের
দুশ্চিন্তায় ঘুম আসে না। বিশিষ্ট কবি, সমাজকর্মী, ছাত্রনেতাদের মিথ্যে মামলায় অভিযুক্ত করে জেলে ঢোকানোর জন্য সদা তৎপর এই সরকারের রাতদিন আলাদা করতে হয় না। কিন্তু কাশ্মীরে মিলিটারি পাঠাতে বা কৃষিনির্ভর দেশের কৃষকদের বিপদে ফেলতে গণতন্ত্রের সামান্য পথটুকুরও সে ধার ধারে না।
তখন অর্ডিন্যান্স আনতে হয় চুপিসারে। পেছনের দরজা দিয়ে। তবে সম্পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক এই সরকার এখন সত্যিই বিপদে পড়েছে। কৃষকদের প্রাণ বিপন্ন করে আন্দোলনে। ইতিমধ্যেই পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই কৃষক বিদ্রোহে ১৫ জন কৃষক প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা কৃষকরা সরকারের কৃষকবিরোধী নীতির মোকাবিলায় মরণপণ যুদ্ধ ঘোষণা করে মাটি আঁকড়ে আছে। ১২ লাখ কৃষকের এই অভূতপূর্ব মেজাজে নিঃসন্দেহে মোদি সরকার ভয় পেয়েছে।
অনেক ঠারেঠোরে বোঝাতে চাইছেন বটে যে এ আন্দোলন মূলত ‘কুলাক’ বা ধনী কৃষকদের। কিন্তু একটু আধটু খোঁজখবর নিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে যে এই আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। এ এক গণ-উন্মাদনা। যেখানে নামাজ পড়ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন, পাহারা দিচ্ছেন শিখ তরুণরা। বলা তো যায় না কে আবার কখন বিজেপি নেতা কপিলমিশ্রের মতো প্রকাশ্যে হাতে পিস্তল উঁচিয়ে ‘গোলি মারো শালাকো’ বলতে বলতে আক্রমণ না করে বসে।
আওয়াজ উঠছে ভগৎ সিং জিন্দাবাদ! ইনকিলাব জিন্দাবাদ! রাজস্থানের গ্রাম আর হরিয়ানার গ্রাম মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তামিলনাড়–র ক্ষেত থেকে গরিব চাষিদের দল ছুটে এসেছে কৃষকদের ধর্না মঞ্চে। এ এক অন্য ভারতবর্ষ। যেখানে নব্য হিন্দুত্ববাদের কোনো জায়গা নেই। ধর্ম নয় এখানে জন্ম নিচ্ছে রুটি-রুজির দাবি। এই কৃষক সংগ্রামে অন্যতম দাবি হয়ে উঠে এসেছে রাজ্যের অধিকার প্রশ্ন। বিজেপির অতি কেন্দ্রিকতা, আধিপত্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে মাথা তুলে উঠে দাঁড়াচ্ছে ফেডারেল কাঠামোর স্বর।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
sdastidar27@gmail.com