ধর্মের দোহাই করে হেফাজতে ইসলামের নেতারা মাঠে নামলেও কার্যত রাজনৈতিক সমর্থনের জোরেই তারা মাঠে সক্রিয় বলে মনে করছেন প্রগতিশীল বলে পরিচিত রাজনৈতিক নেতারা। এদের সঙ্গে বিএনপির সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলেও সন্দেহ তাদের। তারা বলেন, তা না হলে ভাস্কর্যবিরোধী ইস্যুতে বিএনপি চুপ কেন?
হেফাজত নেতা মামুনুল হকের সর্বশেষ বক্তব্য, চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসলে বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল করে শরিয়াহ আইনে দেশ চলবে, সব ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হবে। বিএনপি ‘রহস্যজনকভাবে চুপ’ রয়েছে মন্তব্য করে প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতারা বলেন, বিএনপি এদের সঙ্গে রয়েছে বলেই বাহাত্তরের সংবিধান বাদ দিয়ে শরিয়াহ আইনে দেশ চালানোর হুঙ্কার দেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন হেফাজত নেতারা। কয়েকজন নেতা বলেন, ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে তারা সামনে এলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করা, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে উৎখাত করা। দেশি-বিদেশি চক্রান্তও রয়েছে এখানে।
প্রগতিশীল নেতাদের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করব না। কেন মন্তব্য করবেন না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটি আমাদের রাজনৈতিক কৌশল।’ হেফাজতিদের নব্য জামায়াতি আখ্যায়িত করে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বর্ষীয়ান বাম নেতা পংকজ ভট্টাচার্য্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, হেফাজতে ইসলামের ভাস্কর্যবিরোধী বক্তব্য ও বাহাত্তরের সংবিধান বাদ দিয়ে শরিয়াহ আইনে দেশ চালানোর হুঙ্কার বাঙালি জাতির জন্য একটা অশুভ সংকেত। পাকিস্তানপন্থি সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এ দেশে ১৯৭৫ সালের পরে জিয়া-এরশাদের হাত ধরে পুনর্বাসিত হয়েছে। জিয়া-এরশাদ জবরদস্তি করে এ দেশের মানুষকে পাকিস্তানের পথে হাঁটিয়েছে। খালেদার জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে শুরু করেছে পাকিস্তানপন্থি মৌলবাদী অপশক্তিকে। আওয়ামী লীগও ক্ষমতার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করেছে বিভিন্ন সময়ে। এসবের বহির্প্রকাশ আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। তিনি বলেন, আমাদের আত্মোপলব্ধি করে আত্মশুদ্ধির সময় এসেছে। তাহলেই শুধু বাহাত্তরের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধ অপরাজেয় থাকবে। হেফাজতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক রয়েছে দাবি করে পংকজ বলেন, বিএনপির নিশ্চুপ থাকাই এর প্রমাণ।
১৪ দলীয় জোট নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, হেফাজত নেতারা বিভিন্ন দল থেকে এখানে এসে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে আর তাই সাম্প্রদায়িক এই অপশক্তি ধর্মীয় ইস্যুকে সামনে টেনে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে। ভাস্কর্য নিয়ে মামুনুল হকের বক্তব্যের পর রহস্যজনকভাবে বিএনপির নেতা নিশ্চুপ রয়েছে। তাদের কাছ থেকে আশকারা পেয়ে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে বাহাত্তরের সংবিধান পরিবর্তন করে ফেলা দেশে কোনো ভাস্কর্য থাকবে না বলে ঘোষণা দেওয়ার সাহস দেখিয়েছে। মেনন বলেন, হেফাজতের নাকের ডগায় জিয়াউর রহমানের ভাস্কর্য আছে সেটা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই।
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, যারা ভাস্কর্যবিরোধী কথা বলছে তাদের বেশিরভাগই ২০ দলীয় জোটের হেফাজত নেতা। আর এ জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সংবিধানের চার নীতি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে বাহাত্তরের সংবিধান সংসদে পুনঃপ্রবর্তন করার সময় অধিবেশন বর্জন করে। বিএনপি সংবিধানের চার মূলনীতি মানে না, জাতির পিতা মানে না। মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি। তাদের লাইনেই কথা বলেছেন মামুনুল হক। চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে বাহাত্তরের সংবিধান রাখা হবে না এটা তাদের অমূলক বক্তব্য নয়। ইনু বলেন, আপনারা লক্ষ করেছেন হেফাজতের ভাস্কর্যবিরোধী বক্তব্য নিয়ে রহস্যজনকভাবে বিএনপি চুপ। আমাদের দেশে একটা প্রবাদ আছে মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ, কবুল বলে মেনে নেওয়া। ভাস্কর্য ইস্যুতে বিএনপি তাদের সমগোত্রীয় হেফাজতের বক্তব্য কবুল করে নিয়েছে। আর তাই আশকারা পেয়ে মামুনুল হক বাহাত্তরের সংবিধান থাকবে না বলার সাহস পেয়েছে। সাবেক তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, হেফাজত ধর্মীয় কারণে সামনে আসেনি। তারা শেখ হাসিনার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকারকে ষড়যন্ত্র করে উৎখাত করতে চায়। তারা ভাস্কর্যবিরোধী কথা বলে, আঘাত করে দ্বিতীয়বার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চাচ্ছে। এসব সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে বিচার করে ধ্বংস করে দেওয়া উচিত।
জাসদ আরেক অংশের নেতা শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাহাত্তরের সংবিধান রচনা হয়েছে। এটা সাম্প্রদায়িক কোনো অপশক্তির হুঙ্কারে ধ্বংস করা যাবে না। তিনি বলেন, এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করেছে বিএনপি। জাতীয় পার্টি তা অব্যাহত রেখেছে। একটা সময়ে এসে আওয়ামী লীগও সম্পর্ক স্থাপন করেছে। ক্ষমতার স্বার্থে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে ব্যবহার করার প্রবণতা থাকায় ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার আশকারা পেয়েছে এরা। এই ভুলগুলো মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে সংশোধন করতে হবে। তাহলেই নির্মূল হবে এ অপশক্তি।
কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বলেন, ভাস্কর্যবিরোধী ইস্যু সামনে এনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চার মূলনীতি ধ্বংস করতে চায়। হেফাজতের এসব বক্তব্যের ব্যাপারে বিএনপির চুপ থাকা নিয়ে এই নেতা বলেন, হেফাজতের সঙ্গে বিএনপির ভাবগত ও আদর্শগত মিল রয়েছে। ফলে তারা তো চুপই থাকবে।