শিক্ষা স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হোক দেশ

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনকারী দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য এবারের বিজয় দিবস বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৪৯তম এই বার্ষিকী পেরিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর পথে পা বাড়াবে বাংলাদেশ আর এই মাহেন্দ্রক্ষণটি উদযাপিত হচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষমুজিব বর্ষে। অবশ্য বিশ^ব্যাপী অভূতপূর্ব করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে পৃথিবীর আর সব দেশের মতোই বাংলাদেশও মহামারী সামাল দিতে গিয়ে নজিরবিহীন সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে যেমন জাতীয় সক্ষমতা ও দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে, তেমনি স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে জাতির অর্জন ও ব্যর্থতার নিরিখেও বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই সংকট কাটিয়ে উঠে সামনে এগিয়ে চলার পথ নির্মাণ করা সম্ভব হবে।

করোনা মহামারী মোকাবিলা করতে গিয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাত তথা চিকিৎসাসেবার বহু দুর্বলতা সামনে এসেছে। যার মধ্যে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সম্মিলিত চিকিৎসা অবকাঠামোর পশ্চাৎপদতা যেমন দৃশ্যমান হয়েছে তেমনি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাপনা সংকট ও প্রশাসনিক দুর্নীতির চিত্রও দেশের মানুষকে হতাশাগ্রস্ত করেছে। করোনায় আইসিইউ-শয্যা, ভেন্টিলেটরসহ চিকিৎসা-প্রযুক্তি ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতির ভয়াবহ সংকটে স্বাস্থ্য খাতে অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দের বিষয়টিও সামনে আসে। দেশে এখন স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ, যা জিডিপির ১ শতাংশেরও নিচে। অথচ উন্নয়নশীল বহু দেশেও স্বাস্থ্য খাত জিডিপির ৩-৪ শতাংশ বরাদ্দ রাখছে। দেশে দক্ষ জনশক্তি তথা মানবসম্পদ গড়তে হলে অবশ্যই জনগণের স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষায় আরও অনেক বেশি জোর দিতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্য খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে, মহামারীতে পুরো বছরজুড়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক উপস্থিতি বন্ধ রেখে অনলাইনে পাঠদানের কার্যক্রম আংশিকভাবে চালু রাখা সম্ভব হলেও এমনকি বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়েও স্নাতক বা স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়াও সম্ভব হয়নি। এদিকে, এইচএসসিতে পরীক্ষা না নিয়েই সব শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয়েছে অটো পাস। কিন্তু শিক্ষাবিদরা বলছেন মহামারীকালে শিক্ষা খাতের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রেখে পরিকল্পিতভাবে এগুনো সম্ভব হলে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। এক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ১২-১৩ শতাংশ বা জিডিপির ২ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষাবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় তাই একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের মতো বুনিয়াদি খাতগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করার পাশাপাশি এসব খাত সংস্কারে সরকারকে আরও বিবেচনাপ্রসূত এবং যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এবার বিজয় দিবসের প্রাক্কালে দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দের খবর ছিল বহু আকাক্সিক্ষত পদ্মা সেতু নির্মাণে অগ্রগতির সাফল্য। বিশ^ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিমুখতার পরও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতীকে পরিণত হতে যাচ্ছে। পদ্মা সেতুর এই সাফল্য একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রহণ করা বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সফল সমাপ্তির আশা জাগিয়েছে। এ প্রসঙ্গে এটা উল্লেখ করতে হয় যে, বিগত দশকগুলোতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা টানাপড়েন সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি লাগাতার সমৃদ্ধির পথে এগিয়েছে। জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ এবং সবচেয়ে দ্রুত অগ্রসরমান প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশকে আরও কৌশলী হতে হবে। পাশাপাশি বলা যায়, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট সমাধানে অচলাবস্থা আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। 

এটা মনে রাখা জরুরি যে, অর্থনীতি মূল চালিকাশক্তি হলেও, উন্নয়ন টেকসই করতে হলে মানবিক প্রগতি অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাক্সিক্ষত মান অর্জন করা ছাড়া যেমন সেই সামাজিক অগ্রগতি ও মানবিক প্রগতি অর্জন করা সম্ভব নয়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা ছাড়াও সেটা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুরো চর্চায় ফিরিয়ে আনতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাজনীতির মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ছাড়া সমাজের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক মান যে সামনে এগোয় না, অতিসম্প্রতি দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে অনাকাক্সিক্ষত বিরোধিতা সমাজের এমন বিভক্তি আর অসহিষ্ণুতারই বার্তা দিচ্ছে। অথচ, এ কথা সর্বজনবিদিত যে, সাংস্কৃতিক জাগরণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক চৈতন্যের বিকাশের পথ ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। আজ আবার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সত্যিকার বাস্তবায়ন তাই খুব জরুরি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব মানুষকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।