মুজিব, ভুট্টো ও জেনারেলরা

করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর ডক্টর মুনিস আহমারের লেখাটি ১৪ মার্চ ২০১৮ ডন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখকের সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ থাকলেও অনেকটাই বস্তুনিষ্ঠ বিবেচিত হওয়ায় পাকিস্তানি এই অধ্যাপক ও লেখকের এই রচনাটি ভাষান্তরিত হলো।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানকে তার পূর্বাঞ্চল হারাতে হয়, যদিও বিরোধের বীজ অনেক আগেই বপন করা হয়েছিল। কেন পাকিস্তান টুকরো হয়ে গেল তা সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। যে বাঙালিরা পাকিস্তান আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিল তারা কেন বিচ্ছিন্নতার পথ বেছে নিল সে ব্যাপারেও একই কথা। তবে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যেমন ১৯৭০-এর ৭ ডিসেম্বরের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনোত্তর ১৯৭১-এর ৩ মার্চের উদ্বোধনী অধিবেশন বাতিল করা দেশটিকে দু-টুকরো করার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। অধিবেশন বাতিলের পর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের (১৯৭০-এর নির্বাচনে যে দল ৩০০ আসনের ১৬০ টিতে বিজয়ী) বেসামরিক আইন অমান্য আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিতে অপারেশন সার্চলাইট সামরিক অভিযানের আগে পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বিরাজমান ছিল। সামরিক অপারেশনের পর জিন্নাহর পাকিস্তানের খন্ডীকরণ ঠেকানোর আশা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। দুই অংশের সম্পর্কে ভাঙন ও বৈরিতা থেকে একাত্তরের মার্চের ঘটনাপ্রবাহ এবং পাকিস্তানের সহিংস ভাঙনের পর ৪৭ বছর পেরিয়ে গেছে। পাকিস্তানের ভাঙন ত্বরান্বিত করতে একপক্ষীয় সিদ্ধান্তে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে এ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ভাবনা প্রক্রিয়া (থট-প্রসেস) কী ছিল তা উত্তরহীন প্রশ্নই রয়ে যায়। জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করা থেকে উদ্ভূত ঘটনাগুলোই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে।

১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে ইয়াহিয়া খান রাজত্বের ধূর্ত জেনারেলরা পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর (পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে তার দলের বেশি প্রতিনিধিত্ব ছিল) সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ছয় দফা নিয়ে সমঝোতার অস্বীকৃতির কারণে বাঙালিদের দেখিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কেবিনেটের মন্ত্রী জি ডব্লিউ চৌধুরী তার দ্য লাস্ট ডেইজ অব পাকিস্তান গ্রন্থে এই সত্যটি তুলে ধরেছেন : যখন প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দেন, ভাঙনের শুরুটা সেখান থেকে। নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার জন্য প্রেসিডেন্ট তিন সদস্যের যে কমিটি গঠন করেছিলেন, জি ডব্লিউ চৌধুরী ছিলেন সেই কমিটির একজন। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতিক্রিয়া হ্রাস করতে তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের নতুন তারিখ ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এমনকি প্রেসিডেন্টের অধিবেশন সংগতকরণ ঘোষণার খসড়াও তিনি করে দিয়েছিলেন, তাতে বলা হয়েছিল, যাই হোক আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই এই স্থগিতকরণ দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময়ের জন্য হবে যে, এ সময় আমি দেশের দুই অংশের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাব। চৌধুরী আক্ষেপ করেছেন খসড়াটি আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার হাতে দিই, তিনি তা তার প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদার হাতে দেন, যিনি ভুট্টোর সঙ্গে দল পাকিয়ে প্রস্তাবটির সলিলসমাধি ঘটান।

এতে আওয়ামী লীগের কী প্রতিক্রিয়া হবে যে কেউ তার ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারত। ‘যখনই রেডিওতে পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হলো, ঢাকায় এর সহিংস প্রতিক্রিয়া হলো। মুজিব তার ভাষায় অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু করলেন, এটা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের মতো নয়, আর পাকিস্তানের শাসক জান্তার প্রতিক্রিয়াতেও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সহনশীলতা ছিল না। মুজিবের প্রকাশ্য বিদ্রোহ এককভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণারই সমতুল্য; মুজিবের নির্দেশে প্রায় সমান্তরাল একটি সরকার কাজ করতে শুরু করল। মার্চের ৩ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কর্তৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। ছক কাটা হয়ে গেছে। অখ- পাকিস্তানের দিন তখন হাতেগোনা।

পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করে মুজিব ও আওয়ামী লীগকে প্ররোচিত করে সেনা কার্যক্রমের পথ সুগম করতে সুপরিকল্পিতভাবে এটা করা হয়েছে কি না বলা যাচ্ছে না; নাকি পূর্ব পাকিস্তান যেখানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে এনেছে, সেখানে তাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ইসলামাবাদ হিসেবে ভুল করেছে কি না তাও বলা যাচ্ছে না। ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকেই সামরিক শাসকরা এবং ভুট্টোর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় ছয় দফার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ নমনীয় হবে না, তাদের মতে এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়ে যাবে। একাত্তরে সব রাজনীতিবিদের কাছে ইয়াহিয়া খানের আপিল, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতকরণ এবং পূর্ব পাকিস্তানে এর ফলে উদ্ভূত ঘটনাগুলোর অপব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ প্রমাণ করে পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক শাসকরা কতটা অবিবেচক ও অপেশাদার ছিল যে, আসন্ন বিপর্যয় থেকে দেশটিকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিতে পারল না। ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে শিকার করতে গিয়ে ‘ভুট্টো ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, সেটি কি সামরিক অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্তের জন্যই নয়?

১৯৭১-এর জানুয়ারিতেই এটা বেশ স্পষ্ট হয়ে যায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব, সেনাবাহিনীর পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্ব কিংবা জুলফিকার আলী ভুট্টো সবাইকে ধারণ করে সংকটের সমাধান কেউ চাননি। ছ-দফার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আপসহীন রইলেন। দেশ একটি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুজন।  মুখ্যত যেহেতু আওয়ামী লীগই ৩০০ আসনের পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে, অবশ্যই মুজিবই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন। কিন্তু ভুট্টো জানালেন তার দল ছয় দফা গ্রহণ করছে না, কারণ তা পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থ এবং পাকিস্তানের অখ-তাবিরোধী। ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে গণজমায়েতে ভুট্টো কঠোর হুমকি দিলেন ঢাকায় জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দিতে যদি পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত পরিষদ সদস্য যান, তার ভয়াবহ পরিণতি হবে। তারপরও ভুট্টোর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির জাতীয় পরিষদ সদস্য আহমদ রাজা কাসুরিসহ ৩০ জন সদস্য ঢাকা পৌঁছান। ১৯৭১-এর জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় মুজিবকে অভিনন্দন জানালেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন, ছয় দফা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের যে অনাস্থা ও আশঙ্কা রয়েছে মুখোমুখি তার জবাব দিতে বলেন। কিন্তু উদারভাবে এটি গ্রহণ না করে মুজিব ইয়াহিয়াকে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের আস্থা লাভের একটি সুযোগ হাতছাড়া করলেন। আসন্ন সংকট নিরসনের প্রশ্নে তার হার্ডলাইন অবস্থান জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার একটি সুযোগ ইয়াহিয়াকে প্রদান করল। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের পর পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা হাতে নিতে তাদের ছয় দফার প্রশ্নে একটি সমঝোতামূলক অনুদ্ধত ও যৌক্তিক পথ অবলম্বন করা উচিত ছিল। ৭ মার্চ ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে তিনি যে ভাষণ দেন তা ইউনিল্যাটারাল ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেনডেসের চেয়ে কিঞ্চিৎ কম বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করায় এটা মনে হয়েছে মুজিব তার পার্টির হার্ডলাইনার এবং ছাত্রদের চরম চাপে ছিলেন যেন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেন। (মুনিস আহমার তার কথার সমর্থনে ১৯৭১-এ ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজার এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই অউন কান্ট্রি থেকে উদ্ধৃতি দেন।)

(৭ মার্চ) মুজিব তার ভাষণ পশ্চিম পাকিস্তান কেমন করে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করেছে, নির্বাচিত গণপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা অর্পণ করতে বাধা সৃষ্টি করছে সে কথা বলেন। পূর্ব পাকিস্তানে মোতায়েন পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের ভাই সম্বোধন করে বলেন, তারা যেন পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর গুলি না চালায়, এর অন্যথায় হলে তিনি চরম ব্যবস্থা নেবেন। তার ভাষণে বর্ণিত চার দফা দাবি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার দাবি করেন, সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বলেন, অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান, দ্বন্দ্বকালে নিহত হওয়ার ঘটনাগুলোর পূর্ণ তদন্তের দাবি করেন। পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীকে খাদ্য ও অন্যান্য সরবরাহ কম করতে এবং পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের ফ্লাইট বাতিল করতে বলেন। এভাবে মুজিব কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন, কেবল ঢাকা এয়ারপোর্ট প্রেসিডেন্ট হাউজ এবং ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পাকিস্তানের কর্তৃত্ব বজায় থাকে।

৭ মার্চ ভাষণের পর অবাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফলকে যারা স্বাধীনতার সূচনা মনে করেন, তারা বাকিটুকুর জন্য আওয়ামী লীগকে প্ররোচিত করতে থাকে। ছয় দফা নিয়ে অনমনীয়তার সূত্র ধরে সেনাশক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্তটি আরও অনেক আগেই হয়। সৈন্যবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ার একটি কন্টিনজেন্সি প্ল্যান তৈরি করা ছিল কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল এস এম আহসান কিংবা পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান সেনা অপারেশনে সমর্থন দেননি; তারা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের ওপর জোর দেন। দুজনকেই একই কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং ইয়াহিয়া সরকার লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর নিয়োগ করেন, বাকিটুকু ইতিহাস। সত্তরের নির্বাচনের ফলাফল সেই দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে ভেঙে টুকরো করে দেয়, যার মূল নিহিত বাংলায় ও পাঞ্জাবে। বাংলা ভোট দিয়েছে আওয়ামী লীগকে আর পাঞ্জাব পিপিপিতে সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের নেতৃত্বে পাঞ্জাবিরা। এখানে ভুট্টোর বিজয় আওয়ামী লীগকে জানিয়ে দেয় সামরিক-বেসামরিক চক্র কখনো বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। আসলে পাঞ্জাব বাংলা দ্বন্দ্বই পূর্ব পাকিস্তানে গণযুদ্ধের সূচনা করে এবং এর ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

অনুবাদক : কথাসাহিত্যিক