বিএনপি নেতা হাফিজকে বহিষ্কার ও শওকতকে সতর্ক করা হবে!

দলের হাইকমান্ড সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে বিএনপি থেকে বহিষ্কার হতে পারেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। বহিষ্কারের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তাকে শোকজ করা হয়েছে। এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে শোকজের জবাব দেওয়ার জন্য। এদিকে দলের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডের জন্য সতর্ক করা হতে পারে অপর ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদকে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তাকে শোকজ করা হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তাকে শোকজের জবাব দিতে বলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতা।

বহিষ্কার করার বিষয়ে জানতে চাইলে হাফিজ গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শোকজের চিঠি আজকে পেয়েছি। আমি এখন গণমাধ্যমে কিছু বলব না। আগামী ১৮ ডিসেম্বর আমি শোকজের জবাব দেব। তখন সংবাদ সম্মেলন করে আমি আমার বক্তব্য তুলে ধরব।’ এদিকে শওকত মাহমুদের শোকজের বিষয়ে জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া গেছে। প্রতিদিন প্রেস ক্লাবে সময় দিলেও গতকাল তাকে প্রেস ক্লাবে পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের নেতাকর্মীদের প্রতি অনেক সদয় ছিলেন। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে কঠিন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তার উদাহরণ পাওয়া যায়, এর আগে ১২ অক্টোবর দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে পটুয়াখালী জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ সরোয়ার কালামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। মূলত তার অপরাধ ছিল আইনজীবীদের এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করে বক্তব্য রাখা।

তিনি বলেন, ‘হাফিজ ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় দল ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। এ কারণে দলে তাকে রাখা হলেও স্থায়ী কমিটির সদস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে রাখা হয়নি। এরই মধ্যে সম্প্রতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে নানা ধরনের কটূক্তি করায় তার ওপর ক্ষুব্ধ দলের নেতাকর্মীরা। তারা দলের হাইকমান্ডকে বিষয়টি অবহিত করে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অনুরোধ করেছেন।’

দলের দুই ভাইস চেয়ারম্যানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়ার বিষয়ে গতকাল নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলার বাইরে কেউ নন। একটা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী কখনোই তো দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে পারে না। এটা তো একটা ডিসিপ্লিনের মধ্যে আছে। আমাদের মধ্যে নানা ডিফারেন্স অব অপিনিয়ন হতে পারে, সেটা হাউজের মধ্যে। ওপেন কোনো জায়গায় তো আমরা কোনো কথা বলতে পারি না।’

তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, ‘দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সাংগঠনিক কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে গঠনতন্ত্রে সুস্পষ্টভাবে লেখা আছে।’

কী কারণে দুজনকে ‘শোকজ’ নোটিস দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, ‘আমরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের চিঠি দিয়ে বলেছিকী কারণে শোকজ করা হয়েছে। তারা জবাব দিক, তারপর দল যেটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভা হয়। এতে বিএনপি নেতারা অংশ নেন। সভা শেষে সভায় অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা দুপুর ২টার দিকে রাজধানীর গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় হঠাৎ করে অবস্থান নেয়। এ সময় তারা সরকারেরর পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন সেøাগান দেন। এ বিক্ষোভের কারণে রাস্তার পাশে যানজট তৈরি হয়। আড়াইটার দিকে সেখানে উপস্থিত হন শওকত মাহমুদ, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, কল্যাণ পার্টির সভাপতি সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম। পরে ৩টার দিকে পুলিশের ধাওয়ায় নেতাকর্মীরা অবস্থান ছেড়ে পালিয়ে যান।

ঐদিন সন্ধ্যায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন, ‘সংগঠনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপের জন্য শোকজ করা হয়েছে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদকে। বিশেষ করে গত সোমবার দলীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে অবস্থানের কারণেই তাকে শোকজ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র সাংবাদিক শওকত মাহমুদকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। এছাড়াও তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি ছিলেন।

বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এর আগে গত বছরের ২৬ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দলের নেতাকর্মীরা হাইকোর্টের সামনে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। এতে পুলিশ বাধা দিলে নেতাকর্মীরা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে মারে। এসময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ সময় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, শওকত মাহমুদসহ বেশকিছু নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।’

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি কর্মসূচি ছিল। কর্মসূচি শেষে দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর পুরানা পল্টন-গুলিস্তান এলাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ করে বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মী। ওই বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপি নেতা শওকত মাহমুদ, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া। মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি উলফাতও সেখানে ছিলেন বলে দাবি একাধিক নেতাকর্মীর।