এক বছর দুই মাসেরও বেশি সময় পর আবারও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে এবারের বৈঠকটি ভার্চুয়ালি হচ্ছে। অর্থাৎ গণভবন থেকে যুক্ত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের নয়াদিল্লি প্রান্ত থেকে যোগ দেবেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর আগে গত বছরের ৫ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে তারা বৈঠক করেছিলেন। ওই বৈঠকে ৭ চুক্তি, ৩ প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়েছিল। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর আজ পাঁচটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। এবারের বৈঠকে করোনা পরিস্থিতিসহ বড় বড় বেশ কয়েকটি ইস্যু নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এবারের বৈঠকে চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে বলে জানানো হয়েছিল। এছাড়া আরও ৭টি বিষয় এ বৈঠকে আলোচনায় আসবে বলে জানা গেছে। বৈঠকে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় বন্ধ হওয়া রেলসংযোগ পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থানার চিলাহাটি ও ভারতের কোচবিহারের হলদিবাড়ী রেলসংযোগটি উদ্বোধন করা হবে। দীর্ঘ ৫৫ বছরেও এটি আর চালু হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে পাঁচটি বিষয়ে সমঝোতা স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে হাতি সংরক্ষণ, বরিশালে পয়ঃনিষ্কাশন প্ল্যান্ট স্থাপন, সামাজিক উন্নয়ন, হাইড্রো-কার্বন খাতে সহযোগিতা এবং কৃষি খাতে সহযোগিতা।
দুই দেশের কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এই বৈঠকে নির্ধারিত চুক্তি বা সমঝতা স্মারক স্বাক্ষরের চেয়ে সম্পর্ক ঝালাইয়ের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাবে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা চলছে। তাই এই বৈঠক নিয়ে দুই দেশেরই আগ্রহ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভারতের পক্ষ থেকে জোরালো সমর্থন আদায় এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে। তাই দুই প্রতিবেশী দেশের সরকারপ্রধানদের এবারের বৈঠককে একটু বেশি গুরুত্ব সহকারে দেখছে কূটনৈতিক মহল। বিশেষ করে করোনা সংকট মোকাবিলা এবং করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে জোর দিয়েছিল। গত ১৮ আগস্ট করোনার মধ্যেও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা আকস্মিক ঢাকা সফর করেন। ওই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন তিনি।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সফরে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল করোনা মোকাবিলা ও করোনার ভ্যাকসিন। যদিও ওই সফরের বিষয়ে এখন পর্যন্ত গণভবন কিংবা নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশ্যে কিছু বলা হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেছেন, এই বৈঠকে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে করোনা সহযোগিতা। ভারতের কাছ থেকে সবার আগে ভ্যাকসিন পেতে চায় বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বেক্সিমকো গত ৫ নভেম্বর ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে তিন কোটি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন পাওয়ার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া ভারত সরকারও আশ্বস্ত করেছে তারা সর্বপ্রথম বাংলাদেশকেই ভ্যাকসিন দেবে। এই বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। তবে পানি বণ্টন এবং সীমান্ত সংঘাতের মতো ইস্যুতে আলোচনা বা সমঝোতা না হলে এসব ইস্যু ততটা গুরুত্ব বহন করে না বলে মনে করছেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ রয়েছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান বলেন, ‘দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক থেকে অবশ্যই ভালো কিছু আসবে। তবে আমাদের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে ভারতের জোরালো সমর্থন আদায় করে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চয়ই গুরুত্ব পাবে। এর বাইরে করোনার ভ্যাকসিন পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। ভারতের কূটনৈতিক দপ্তরের বরাত দিয়ে সে দেশের সংবাদমাধ্যমে গত কয়েক দিন ধরে এই বৈঠক সম্পর্কে বলা হচ্ছে, গত এক বছর ধরে দুই দেশের সম্পর্কের যে শীতলতা চলছে, তা স্বাভাবিক করারও চেষ্টা থাকবে এই বৈঠকে।’
তিস্তা নিয়ে কিছু থাকছে না : ভারত-বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক মানেই জনগণের ভাবনায় থাকে পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে তিস্তা চুক্তি। ভারত সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে দুবার এই চুক্তি করার বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির মুখে তা আর হয়ে ওঠেনি। এই বৈঠকে পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও গত ১৮ নভেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছিলেন, ভারতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকে কোনো ‘ম্যাজিক’ থাকবে না।
তিস্তা চুক্তির বিষয়ে তিনি গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘চুক্তিটি অনেক আগেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। এমনকি ভারতের পক্ষ থেকে চুক্তির প্রতিটি পাতায় স্বাক্ষর করা হয়েছে। এখন শুধু বাস্তবায়নের অপেক্ষা। এখন আমরা (ঢাকা) বিষয়টি তাদের (নয়াদিল্লি) ‘প্রতিশ্রুতির সম্মানের’ ওপর ছেড়ে দিয়েছি। কারণ বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে সব সময় এই ইস্যুটি তুলে আমরা তাদের অস্বস্তির মধ্যে ফেলতে চাই না।’ তবে এই বৈঠকে দু’দেশের মধ্যে বয়ে চলা প্রধান সাতটি নদী মনু, মুহুরি, গোমতি, ধরলা, দুধকুমার, ফেনী ও তিস্তার পানি বণ্টনের ইস্যুটিকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এজন্য যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব রাখা হতে পারে।
হাসিনা-মোদির এই বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কিছু রোহিঙ্গা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু ভারতও তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। এরপর থেকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বারবার ভারতের সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। মোদি সরকারের উচ্চ থেকে নিম্ন সর্ব পর্যায় থেকে সহায়তারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটা কেবল মুখেই। ভারত আন্তর্জাতিকভাবে কখনোই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকেনি। এই ইস্যুতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের ভোটাভুটিতে দেশটির ভোট পায়নি বাংলাদেশ। এছাড়া ভারত রাখাইনে মিয়ানমারের শিল্প জোনে বড় বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এখনো ভারতকে কাছে পেতে চায় বাংলাদেশ। গত মঙ্গলবারও আন্তর্জাতিক ফোরামে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারতকে পাশে চেয়েছেন। আজকের বৈঠকেও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
গতকাল ছিল মহান বিজয় দিবস। দীর্ঘ ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত ছিল আমাদের প্রধান বন্ধু। অথচ গতকাল বিজয় দিবসেও লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে এক বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। নিয়মিত বিরতিতে এই সীমান্ত হত্যা চলছেই। ঢাকার পক্ষ থেকে বারবার সীমান্ত হত্যা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। দিল্লিও বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু হত্যা আর বন্ধ হয় না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, হাসিনা-মোদির এই বৈঠকে সীমান্ত হত্যা বন্ধের বিষয়টি আবারও তুলে ধরা হবে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং আমরা অবশ্যই ভারতের কাছে এর ব্যাখ্যা চাইব।’
এছাড়া এবারের বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের বিষয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের যেসব পণ্যে ভারত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে রেখেছে সেগুলোর বিষয়ে আলোচনা করবে ঢাকা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য যেন নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পারে, সে লক্ষ্যে ঢাকা দু’দেশের মান নিয়ন্ত্রক কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে একটি ‘অভিন্ন গুণগতমান’ ঠিক করার প্রস্তাব দেবে।’
বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। বাংলাদেশ এতদিন ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। তবে দেশে এখন সক্ষমতা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। তাই ভারতের সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে চায়। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হতে পারে। এছাড়া ভুটানের ইচ্ছা অনুযায়ী ভারতের ভেতর থেকে ভুটানে বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়টিও আলোচনা হতে পারে। আলোচনা হতে পারে দুই দেশের সড়ক ও রেলপথে পুনরায় যাতায়াত চালুর বিষয়টি। এছাড়া বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তে মেহেরপুরের মুজিবনগরে জিরো লাইনে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কটিকে দুই প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে ‘স্বাধীনতা সড়ক’ ঘোষণা দেবেন। সড়কটি যে স্থানে অবস্থিত সেখানে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয়।