অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ, পদে বহাল উপপরিচালক মারুফ

উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এইচএসটিটিআই) খুলনার উপপরিচালক (সংযুক্ত) ও বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (মাউশি) অধ্যাপক ড. শেখ মোহতাশামুল হক মারুফের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে নিরীক্ষা কমিটির তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা মিললেও এখনো স্বপদে বহাল আছেন তিনি। শুধু তাই নয়, নিয়মিত বেতনভাতা তোলাসহ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছেন। বিস্তর অভিযোগের পরও যেন তাকে ছাড়া চলছেই না সরকারি এ দপ্তরের কাজ।

খুলনা এইচএসটিটিআইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ড. মারুফ খুলনা ব্রজলাল (বিএল) কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপকের মিথ্যা পরিচয়ে বছরের পর বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা বোর্ডের পরীক্ষক এবং পরীক্ষার প্রশ্নপ্রণেতার দায়িত্ব পালন করেছেন অবৈধভাবে। মারুফের বিরুদ্ধে রেস্ট হাউজের সুপারের দায়িত্ব থাকাকালীন অর্থ আত্মসাৎ, আর্থিক অনিয়ম, তিন অর্থ বছরে কোনো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া, প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি ছাড়াই ইচ্ছামতো খরচ করা, ভুয়া ও কাঁচা (হাতে লেখা) ভাউচারে বিল, বিধি লঙ্ঘন করে কয়েক মাসে আয়ের তুলনায় ১০ গুণ বেশি খরচ দেখানো, সরকারি নিয়মবহির্ভূতভাবে রসিদ বা প্রমাণপত্র ছাড়াই অর্থ গ্রহণ, আয়-ব্যয়ের রেজিস্টারে কাটাছেঁড়া ও ওভাররাইটিং এবং স্টক রেজিস্টারের মধ্যে ভাউচারে ও চাহিদাপত্রের বিপরীতে কেনা মালামালের গরমিলসহ বিস্তর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পরিচালকের অনুমতি ছাড়া অফিসের আলমিরা খুলে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরানো এবং সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে অসদাচরণ, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদশর্ন করায় আড়ংঘাটা থানায় আলাদা দুটি সাধারণ ডায়েরিসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ড. মারুফকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছেন। কিন্তু এতসব গুরুতর অভিযোগ মাথায় নিয়ে বহাল তবিয়তেই আছেন ক্ষমতাধর এ কর্মকর্তা।

নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ড. শেখ মোহতাশামুল হক মারুফ প্রতিষ্ঠানের অতিথি ভবনের (রেস্ট হাউজ) সুপারের দায়িত্ব গ্রহণের পর (২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০) তিন অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসাব দাখিল করেননি। প্রাথমিক হিসাব দাখিল করেই পদ থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন তিনি। তখন তাকে আয়-ব্যয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য একাধিকবার বলা হয়। সর্বশেষ চলতি বছর ১৩ জুলাই আয়-ব্যয়ের রেজিস্টার খাতা, রসিদ বই, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাখিলের জন্য তাকে নোটিস দেওয়া হয়। নোটিস পাওয়ার পর প্রতিবেদন ছাড়াই শুধু একটি রেজিস্টার খাতা, আয়-ব্যয়ের একটি হিসাব খাতা ও কাঁচা ভাউচার জমা দেন তিনি। বিষয়টি সরকারি বিধিমতো না হওয়ায় এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পরিচালক মানজার আলমকে আহ্বায়ক এবং সহকারী পরিচালক শামীমা আখতার ও উপপরিচালক ড. প্রদীপ কুমার ম-লকে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি অডিট কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি সব বিষয়ে পর্যালোচনা শেষে চলতি বছর ১২ ও ১৪ অক্টোবর দুটি সভা করে ২৫ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিথি ভবনের সুপার প্রফেসর ড. মোহতাশামুল হকের কাছ থেকে চলতি বছরের ১১ অক্টোবর ১২টি রেজিস্টার খাতা, আর্থিক আয়-ব্যয়ের একটি হিসাব খাতা, একটি স্টক রেজিস্টার খাতা এবং মালামাল গ্রহণের ৪১টি চাহিদাপত্র বুঝে পাওয়া যায়। কমিটি সেগুলো যাচাই-বাছাই এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চরম অনিময় ও দুর্নীতি খুঁজে পায়। অধ্যাপক মারুফ ২০১৭ সালে রেস্ট হাউজের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে চলতি বছর ৪ অক্টোবর পর্যন্ত তিন অর্থবছরে নিয়মবহির্ভূতভাবে কোনো রসিদ ছাড়াই টাকা আদায় করে সেই অর্থ সরকারি ফান্ডে অর্থাৎ ব্যাংকে জমা দেননি, যা চরম আর্থিক অনিয়ম। এছাড়া চাহিদাপত্র এবং আয়-ব্যয়ের হিসাবসহ বিভিন্ন খাতে প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি বা স্বাক্ষর ছাড়াই নিজের ইচ্ছামতো কাজ করেছেন। ২০১৭-১৮ সালে দেড় বছর ধরে কয়েকজন শিক্ষক রেস্ট হাউজে ছিলেন। কিন্তু তাদের জমা দেওয়া টাকার কোনো সঠিক হিসাব নাই। ওই টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অডিট কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে। রেস্ট হাউজে ২০১৯ সালের মার্চে আয় হয়েছে ৪ হাজার ১৪০ টাকা, কিন্তু ওই সময়কালে অধ্যাপক মারুফ ব্যয় করেছেন ৪৩ হাজার ৭৬৭ টাকা। এছাড়াও চলতি বছর ফেব্রুয়ারি ও জুন মাসে আয়ের ১০ গুণ বেশি টাকা খরচ করা হয়েছে। ওই অর্থের উৎস কী এবং কোন স্বার্থে অর্থ অগ্রিম ব্যয় করা হয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এর বাইরে ২০১৯ সালে বেশকিছু টাকা মজুর খরচ হিসেবে দেখানো হলেও মজুরি গ্রহণকারীর স্বাক্ষর নেই। এছাড়া এ বছর একটি হিসাব দেখানো হলেও তার ভাউচার দেওয়া হয়নি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সরকারি অর্থের অনিয়মসহ নানা দুর্নীতির সত্যতা পাওয়ায় অভিযুক্ত অধ্যাপক ড. মোহতাশামুল হক মারুফের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়।

তবে মোহতাশামুল হক তার বিরুদ্ধে উঠে আসা আর্থিক অনিয়মের তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অডিট কমিটি পরিচালক তার মদদপুষ্ট ব্যক্তিদের দিয়ে অডিট করিয়ে একটি অসত্য প্রতিবেদন দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সঠিক নয়। সুপারের দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ায় যথাযথ নিয়মে অব্যাহতি নিয়েছি। প্রতিষ্ঠানের নিয়মবহির্ভূত কোনো কাজ বা অনিয়ম-দুর্নীতি করিনি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খুলনা এইচএসটিটিআইয়ের পরিচালক (প্রশাসন) ড. মো. আতিকুল ইসলাম পাঠান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অডিট কমিটির একটি প্রতিবেদন পেয়েছি, যাতে ১৩টি মন্তব্য করা হয়েছে। এতে বেশকিছু অনিয়ম উঠে এসেছে। এর বেশি কিছু বলা যাবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’