রাজধানী ঢাকায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি সাধারণভাবে ‘শিক্ষা ভবন’ হিসেবে পরিচিত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এই শিক্ষা ভবন দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের আখড়া হিসেবে আলোচিত-সমালোচিত। এখানকার একশ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারী কিছু শিক্ষকদের সঙ্গে মিলে সারা দেশের শিক্ষক সমাজের বিপুল অংশকে যেমন জিম্মি করে রেখেছে, তেমনি শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতির মাধ্যমে জনগণের করের অর্থ লুটপাট করে যাচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের শিরোনাম দেখলেই এমন অভিযোগের সত্যতা মিলবে। কিন্তু শিক্ষা ভবনের দুর্নীতি থামাতে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নানা নির্দেশনা এলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মকর্তাদের দুর্র্নীতির অভিযোগ তদন্তে বিভিন্ন সময়ে নানা কমিটির প্রতিবেদন সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ কমই হয়। আর অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও অভিযুক্তদের বদলির আদেশেই তার সমাপ্তি ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় স্বপদেই বহাল থাকেন কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ, পদে বহাল উপপরিচালক মারুফ’ শিরোনামে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এইচএসটিটিআই) খুলনার উপপরিচালক (সংযুক্ত) ও বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (মাউশি) অধ্যাপক ড. শেখ মোহতাশামুল হক মারুফের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের নানা অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ইতিমধ্যে নিরীক্ষা কমিটির তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা মিললেও এখনো স্বপদে বহাল আছেন তিনি। শুধু তাই নয়, নিয়মিত বেতনভাতা তোলাসহ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছেন। মারুফের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির রেস্ট হাউজের সুপারের দায়িত্ব থাকাকালীন অর্থ আত্মসাৎ, আর্থিক অনিয়ম, তিন অর্থবছরে কোনো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া, প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি ছাড়াই ইচ্ছামতো খরচ করা, ভুয়া ও হাতে লেখা ভাউচারে বিল, বিধি লঙ্ঘন করে কয়েক মাসে আয়ের তুলনায় ১০ গুণ বেশি খরচ দেখানোর মতো অভিযোগও আছে। এমনকি পরিচালকের অনুমতি ছাড়া অফিসের আলমিরা খুলে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরানো এবং সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে অসদাচরণ, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদশর্ন করায় আড়ংঘাটা থানায় আলাদা দুটি সাধারণ ডায়েরিও আছে।
ভয়াবহ বিষয় হলো শুধু খুলনা এইচএসটিটিআই-এর উপপরিচালক পদে থেকে দুর্নীতিই নয়, তিনি খুলনা ব্রজলাল (বিএল) কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপকের মিথ্যা পরিচয়ে বছরের পর বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা বোর্ডের পরীক্ষক এবং পরীক্ষার প্রশ্নপ্রণেতার দায়িত্ব পালন করেছেন অবৈধভাবে। প্রশ্ন হলোভুয়া পরিচয়ে কীভাবে একজন ব্যক্তি জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে দেশের সহস্রাধিক কলেজের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমে প্রশ্ন প্রণয়ন ও পরীক্ষকের মতো দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পান?
সারা দেশে এখন কেবল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ই আছে ১৮ হাজার ৫৯৮টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন আড়াই লাখের মতো। এ ছাড়া দেশে কলেজ আছে ৪ হাজার ৫শ’র ওপরে। কলেজগুলোতে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার। মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে একই সঙ্গে রয়েছেন বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী। অভিযোগ আছে শিক্ষা ভবনে সক্রিয় নানা অসাধু চক্র দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষক-কর্মকর্তার নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, এমপিওভুক্তিসহ নানা প্রশাসনিক কর্মকা-ে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। অসাধু চক্রটির অনেকেই বছরের পর বছর ধরে শিক্ষা ভবনে চাকরি করছেন।
শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির বিষয়ে মাউশি বা শিক্ষা ভবনের দুর্নীতির অভিযোগও অনেক পুরনো। গত বছর এমপিওভুক্তিতে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ৮৬ জনের একটি তালিকা পাঠানো হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। ওই তালিকা ধরে মাউশি শুদ্ধি অভিযানও পরিচালনা করে। এমন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে উপবিভাগীয় পরিচালক, সহকারী পরিচালক, জেলা শিক্ষা অফিসার থেকে পিয়ন পর্যন্ত রয়েছে। গত বছর শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতির আরেক অভিযোগে শিক্ষা ক্যাডারের ৩০ কর্মকর্তাকে বদলির সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, চলতি বছরের শেষ দিকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে বদলি করার জন্য শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর স্বাক্ষর জাল করেন মাউশি’র মহাপরিচালকের দপ্তরের একজন অফিস সহায়ক বা পিয়ন। বিষয়টি ধরা পড়ায় অভিযুক্ত অফিস সহায়ক মো. জুয়েলকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। প্রশ্ন হলো বিভাগীয় ও জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে বসেও এমন দুর্নীতি করা গেলে শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতি রোধ করা যাবে কীভাবে?