সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধি অনুযায়ী শুধু সরকারি কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারে। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর জন্য এমন সুযোগ না থাকায় এ সংক্রান্ত সিকিউরিটিজ আইন থেকে অব্যাহতি দিয়ে বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডকে (লা মেরিডিয়ান হোটেল) স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিতর্কের মুখে সেই চিঠির কার্যকারিতা নিজেই স্থগিত করেছেন অর্থমন্ত্রী। গতকাল অর্থমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে একান্ত সচিব ড. মো. ফেরদৌস আলম পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম গ্রহণ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
অবশ্য এর একদিন আগেই বেস্ট হোল্ডিংসের সরাসরি তালিকাভুক্তিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে কোম্পানির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।
গত ৮ সেপ্টেম্বর এসইসির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত চিঠিতে অবকাঠামো প্রকল্প বা প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কোম্পানির ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে ডিরেক্ট লিস্টিং রুলস শিথিল করার সুপারিশ করা হয়, যেখানে সরাসরি তালিকাভুক্তির এই সুবিধাটি শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর জন্য দেওয়া আছে। পাশাপাশি শেয়ারের দাম নির্ধারণের নিয়মেও ছাড় দিতে বলা হয়। এক্ষেত্রে তফসিলি ব্যাংকগুলো যে গড় মূল্যে অবকাঠামোগত প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করবে, তাই ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের (সরাসরি তালিকাভুক্ত) মাধ্যমে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে শেয়ারপ্রতি ন্যূনতম দর (ফ্লোর প্রাইস) হিসেবে গণ্য করার অনুরোধ ছিল অর্থমন্ত্রীর চিঠিতে। এ ছাড়া ন্যূনতম পাঁচ বছর বাণিজ্যিক কর্মকা-ে থাকা, ন্যূনতম শেয়ার অফলোড, পূর্ববর্তী দুই বছর শেয়ার ইস্যুসহ সিকিউরিটিজ আইনের বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি চাওয়া হয়।
২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর এসইসির জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে গত সেপ্টেম্বরে পাঠানো অর্থমন্ত্রীর ওই চিঠি দেখিয়ে ও বেস্ট হোল্ডিংসে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের বিনিয়োগকে ‘সরকারি মালিকানার তকমা’ সরাসরি তালিকাভুক্তির আয়োজন করেছিলেন ডিএসই একজন প্রভাবশালী শেয়ারহোল্ডার পরিচালক, যিনি ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারির দায়ে অভিযুক্ত। ডিএসইর এই শেয়ারহোল্ডার পরিচালকের সঙ্গে স্বতন্ত্র পরিচালকদের একটি অংশও জড়িত ছিলেন। আইপিও পর্যালোচনা কমিটির সব সদস্যই স্বতন্ত্র পরিচালক। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া শেয়ারহোল্ডার ওই পরিচালকের পক্ষে বেস্ট হোল্ডিংসকে সরাসরি তালিকাভুক্তির আয়োজন করা অসম্ভব।
ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা পৃথক করতে স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশন করা হয়, যেখানে বেশিরভাগ পরিচালক স্বতন্ত্র, এমনকি চেয়ারম্যানও স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হয়। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে ডিমিউচুয়ালাইজেশন করা হয়েছে, তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এখন পর্যন্ত স্টক এক্সচেঞ্জ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনায় স্বতন্ত্র পরিচালকরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। মেধাবী কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই ডিমিউচুয়ালাইজেশন-পরবর্তীতে স্টক এক্সচেঞ্জ ছেড়ে চলে গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে বেস্ট হোল্ডিংসের মতো স্বল্প আয়ের বেসরকারি কোম্পানিকে আইনে সুযোগ না থাকার পরও সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বেস্ট হোল্ডিংসের প্রসপেক্টাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের তুলনায় এর বিক্রি বা টার্নওভার খুবই কম। ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে বেস্ট হোল্ডিংসের রেভিনিউ ছিল ২০৭ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০ হিসাব বছরে ৩৭৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। রেভিনিউ ২০১৯-২০ হিসাব বছরে ২৮৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। এ সময় কোম্পানিটি নিট মুনাফা দেখিয়েছে ৯৩ কোটি টাকা। তালিকাভুক্ত অন্যান্য হোটেল ব্যবসার চেয়ে বেস্ট হোল্ডিংসের রেভিনিউর তুলনায় নিট মুনাফা অনেকটাই অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিট চলতি সম্পদের মানও ঋণাত্মক, যা সরাসরি তালিকাভুক্তির শর্তের পরিপন্থী। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে সমন্বয়ের পর কোম্পানির ইপিএস মাত্র ১ টাকা ৩৫ পয়সা, যা আগের হিসাব বছরে ছিল ৩ টাকা ৮৩ পয়সা।
২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বেস্ট হোল্ডিংস এসইসির কাছে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ২৮৩ কোটি টাকা সংগ্রহের আবেদন জানায়। এ জন্য ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ৪ কোটি ৩৫ লাখ শেয়ার ৬৫ টাকা দরে (৫৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ) ইস্যু করার জন্য আবেদন করেছিল। যৌথভাবে কোম্পানিটির ইস্যু ম্যানেজারের দায়িত্বে রয়েছে রেস পোর্টফোলিও অ্যান্ড ইস্যু ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ও আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেস্ট হোল্ডিংস মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পরিশোধিত মূলধন ৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা থেকে ৮৭০ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় উন্নীত করেছে। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) মাত্র ১ টাকা ৩৫ পয়সা। এমন কোম্পানির শেয়ার ৫৫ টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এর বাইরে তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি মিউচুয়াল ফান্ডও প্লেসমেন্ট শেয়ার কিনেছে। এমনকি ইস্যু ম্যানেজারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও এই কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডার।
বেস্ট হোল্ডিংসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এই কোম্পানির ২৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং রূপালী ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বেস্ট হোল্ডিংসে। এক্ষেত্রে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার ৫৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৬৫ টাকা দরে কিনেছে। শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) উল্লেখযোগ্য না হলেও বড় অঙ্কের প্রিমিয়ামে এই কোম্পানির শেয়ার কেনায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ।
বেস্ট হোল্ডিংসের প্রসপেক্টাস অনুযায়ী কোম্পানিটি ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করার মাধ্যমে ৪৭২ কোটি ৮০ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছে। ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বেস্ট হোল্ডিংসের পরিশোধিত মূলধন ছিল ৮ কোটি ৮৩ লাখ ১০ হাজার টাকা, যা হঠাৎ করেই ২০২০ সালের ৩০ জুন শেষে ৮৭০ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। মোট পরিশোধিত মূলধনে উদ্যোক্তাদের অংশ ৪৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
এ অবস্থায় বেস্ট হোল্ডিংসকে সরাসরি তালিকাভুক্তির পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়ার জন্য ওই কোম্পানিতে প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের বিনিয়োগকে ‘সরকারি মালিকানা’ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ আদৌ আছে কি-না সেই ব্যাখ্যা ডিএসইর কাছে চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এসইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, বেস্ট হোল্ডিংস ২০১৯ সালের আগস্ট মাস থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে মোট ৬৬২ দশমিক ২ কোটি টাকা তুলেছে। কিন্তু ডিরেক্ট লিস্টিং রেগুলেশনস অনুযায়ী কোনো কোম্পানি সর্বশেষ দুই বছরের মধ্যে এভাবে তহবিল সংগ্রহ করে থাকলে বা সিকিউরিটিজ ইস্যু করে থাকলে সেই কোম্পানি সরাসরি নিবন্ধিত হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারে না। এই অযোগ্যতার বিষয়টি ডিএসই কীভাবে বিবেচনা করছে, সেই ব্যাখ্যাও চেয়েছে এসইসি।
এসইসি বলেছে, ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বেস্ট হোল্ডিংসের নিট চলতি সম্পদের মানও ঋণাত্মক, যা ডিরেক্ট লিস্টিং সংশ্লিষ্ট নিয়মের পরিপন্থী। এ ছাড়া বেস্ট হোল্ডিংস ৪ কোটি ৩৫ লাখ শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়তে চায়, যা তাদের মোট ৮৭ কোটি শেয়ারের মাত্র ৫ শতাংশ। অথচ সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে হলে আইন অনুযায়ী অন্তত ২৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়তে হয়। এসব বিষয়েও ডিএসই কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যাখ্যা চেয়েছে এসইসি।