১৪ লাখ পোশাকশ্রমিক পাননি প্রণোদনার টাকা

করোনা পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাত রক্ষায় সরকার যে প্রণোদনার অর্থ দিয়েছে তার ৮৪ শতাংশ মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি বলছে, শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে সরকার যে প্রণোদনা দিয়েছিল সেই টাকা বণ্টনে বড় ধরনের গাফিলতি হয়েছে। অন্তত ১৪ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক প্রণোদনার অর্থ পাননি। এ ছাড়া সরকার ও মালিকদের অসহযোগিতার কারণে আরও ১০ লাখ শ্রমিক বিদেশি সহায়তার অর্থ পাননি। গতকাল বৃহস্পতিবার টিআইবির প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। ‘তৈরি পোশাক খাতে করোনাভাইরাস উদ্ভূত সংকট : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার রপ্তানিমুখী শিল্পের এপ্রিল-জুলাই মাসের বেতন পরিশোধের জন্য ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা স্বল্পসুদে প্রণোদনা হিসেবে দেয়। যার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের ২ হাজার ৪৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলে তৈরি পোশাক খাতের ঋণের পরিমাণ ৩৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীতকরণ ও সুদের হার কমানো হয়। করোনাকালে তৈরি পোশাক খাতে মোট প্রণোদনার ৯৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ (৬১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা) দেয় সরকার। ১ দশমিক ৪০ শতাংশ (৮৭৫ কোটি টাকা) দেয় বিদেশি একাধিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। সরকারের দেওয়া মোট প্রণোদনার ৫৯ হাজার ৯০ কোটি টাকা ভর্তুকি সুদে ঋণ সহায়তা প্যাকেজের আওতায় দেওয়া হয়। এই প্রণোদনা সহায়তা বিশ্লেষণ করে টিআইবি বলছে, এসব সহায়তার ৮৪ শতাংশ অর্থাৎ ৫২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পোশাক কারখানা মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ এপ্রিল-জুলাই মাসে পোশাকশ্রমিকদের মোট বেতন ও ভাতা বকেয়া ছিল ১২ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। সরকার বেতন-ভাতা বাবদ এর চেয়ে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ কম অর্থাৎ ৯ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা দেওয়ায় ৪২ দশমিক ০২ শতাংশ বা ১৪ লাখ শ্রমিক প্রণোদনার অর্থ থেকে বঞ্চিত হন। এ ছাড়া শ্রমিকদের সহায়তায় বিদেশি প্রণোদনা ৮৭৫ কোটি টাকা বণ্টনে মালিকপক্ষ ও সরকারের বড় ধরনের অসহযোগিতা ছিল। এতে ওই টাকা থেকেও বঞ্চিত হন শ্রমিকরা।

টিআইবির গবেষণা বলছে, প্রণোদনার অর্থ সময়মতো না পাওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক করোনাসংকটে মানবেতন জীবনযাপন করেন। যে কারখানার মালিকরা প্রণোদনার অর্থ পেয়েছেন, সেই কারখানার শ্রমিকদেরও ছাঁটাই করা হয়েছে। প্রণোদনা পাওয়া ৬৪ কারখানার ২১ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৬০-৬৫ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। এ ছাড়া অর্ডার বাতিল করার অজুহাতে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব শ্রমিককে পাওনা পরিশোধ করেননি মালিকরা। অনেক ক্ষেত্রে কারখানাগুলোতে ইচ্ছাকৃত ছাঁটাই আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে কম বেতন ও মজুরি ছাড়া অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কাজ করানো হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য ছাড়া অন্য কারখানার শ্রমিকরা কোনো সুবিধা পাননি। এমনকি সাব-কনট্রাক্ট কারখানাগুলোর জন্য কোনো নির্দেশনা না থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩ হাজার কারখানার প্রায় ১৫ লাখ শ্রমিকের বেতন-ভাতা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

মালিকপক্ষের লে-অফ করা কারখানার শ্রমিকদেরও এপ্রিলে ৬৫ শতাংশ বেতন দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অঙ্গীকার মানা হয়নি। লে-অফ ঘোষণার কারণে এক বছরের কম সময় কর্মরত অনেক শ্রমিক কোনো সুবিধা ছাড়া চাকরি হারান। ফলে কিছু কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আবার অনেক কারখানা ঈদ-পরবর্তী ছয় মাসেও ঈদ বোনাসের বাকি অর্ধেক পরিশোধ করেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারখানা অগ্রিম নোটিস না দিয়ে অর্ডার বাতিল করার অজুহাতে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব কারখানায় শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করা হয়নি। ফলে করোনাসংকটে শ্রমিকরাই আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। আর অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায়, করোনাসংকটে তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত প্রায় ৭৭ শতাংশ শ্রমিক তাদের পরিবারের সব সদস্যের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না।

টিআইবি আরও বলছে, প্রণোদনার অর্থপ্রাপ্তিতে বড় কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও তদবিরে। এ ক্ষেত্রে ছোট ব্যবসায়ীরা সুবিধা কম পেয়েছেন। ছোট ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহ ছিল। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য টাকা পরিশোধে এক বছর সময় নির্ধারণ করা হলেও বড় ব্যবসায়ীদের জন্য টাকা পরিশোধে দুই বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। টিআইবি বলছে, শ্রমিকরা একদিকে আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার বা মালিকপক্ষের কোনো দায়িত্বশীল কর্র্তৃপক্ষ কারখানা বন্ধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সরকার সাধারণ ছুটি বর্ধিত করলেও মালিকরা অপরিকল্পিতভাবে কারখানা খুলে দেন, ফলে শ্রমিকদের হয়রানির শিকার হতে হয়।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি জানায়, করোনা পরিস্থিতিতে মালিক সংগঠনগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতার অভাব ছিল। দেখা যাচ্ছে, সরকার প্রকাশিত তথ্যের তুলনায় বিজিএমইএ প্রকাশিত তালিকায় শ্রমিক ছাঁটাই এবং করোনা আক্রান্ত শ্রমিকের সংখ্যা কম দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া বাতিল হওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যাদেশ পুনর্বহাল হলেও বিজিএমইএ সে বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তথ্য প্রকাশ করেনি। আর শুধু তা-ই নয়, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে কারখানা থেকে পাওয়া তথ্যে বাতিল করা কার্যাদেশের পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের প্রমুখ।

টিআইবির প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লে-অফকৃত শ্রমিকের পক্ষে প্রণোদনার টাকা পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ টাকা সরাসরি শ্রমিকের ব্যাংক হিসেবে গেছে। আর আমি যখন টাকা দিয়েছি, তখন সে আমাদের নিয়মিত শ্রমিক। শ্রমিকের বেতনের জন্য প্রয়োজন সেটুকুই দিয়েছে। যেসব শ্রমিক প্রণোদনার টাকা পায়নি, তাদের মালিকপক্ষ নিজস্ব উৎস থেকে বেতন পরিশোধ করেছে। টিআইবি প্রশ্ন তুলতে পারত তখন, যখন তারা এমন কোনো শ্রমিক খুঁজে পেত, যারা বেতন পায়নি।’