অগণতান্ত্রিক কিংবা হঠকারী কোনো কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপি সরকার পরিবর্তনে বিশ^াস করে না। তাই দলের কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এমন কোনো কর্মসূচিতে জড়ালে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানিয়েছেন দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা। তারা বলেন, দলের কোনো কর্মসূচি না থাকলেও গত সোমবার কয়েকশ নেতাকর্মী নিয়ে পুরানা পল্টন ও মুক্তাঙ্গনে জড়ো হয়ে সরকারবিরোধী সেøাগান দেওয়ার অপরাধে দলের দুই ভাইস চেয়ারম্যানকে শোকজ করা হয়েছে। এর মধ্যে শওকত মাহমুদ শোকজের জবাব দিয়েছেন। আর আগামীকাল শনিবার সকালে শোকজের জবাব দেবেন মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ। পরে বিকেলে দলের স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভায় তাদের জবাব পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সভায় লন্ডন থেকে যুক্ত থাকবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শোকজের চিঠি পাওয়া শওকত মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে শোকজ করা হয়েছিল। আমি তার জবাব দিয়েছি। এখন দল যে সিদ্ধান্ত নেয় তা মেনে নেব।’ তবে শোকজে কী লিখেছেন সে বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। দপ্তরসংশ্লিষ্ট নেতারা বলেছেন, শোকজের জবাবে শওকত মাহমুদ লিখেছেন, ‘আমি বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে যাইনি। পেশাজীবী সংগঠনের কর্মসূচিতে গিয়েছি। এর সঙ্গে বিএনপির বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কি না তা আমি জানতাম না। তবে এটা যদি দলের বিরুদ্ধে যায় কিংবা শৃঙ্খলা পরিপন্থী হয় তার জন্য আমি দুঃখিত। পরবর্তীতে এ ধরনের কোনো কর্মসূচিতে আমি যাব না বলে অঙ্গীকার করছি।’
শোকজের জবাবের বিষয়ে মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামীকাল শনিবার আমি শোকজের জবাব দেব। আমার জবাব লোক মারফত নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পাঠাব। এরপর সাংবাদিকরা আমার বাসায় এলে আমি এ বিষয়ে কথা বলব।’
পুরানা পল্টন মোড়ে ওইদিন কেন গিয়েছিলেন জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদের আমন্ত্রণে সেখানে গিয়েছিলাম। তাছাড়া কাছেই আমাদের মুক্তিযোদ্ধা দলের অফিস।’
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওইদিন মেজর (অব.) হাফিজ প্রেস ক্লাবের কর্মসূচিতে যাননি। এমনকি পুরানা পল্টন কিংবা মুক্তাঙ্গনেও যাননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রথমে নেতাদের শোকজ করা হয়। তারা শোকজের জবাব দিলে দলের হাইকমান্ড তা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। আগামীকাল শনিবার দলের স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভা আছে। সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
গত ১৪ ডিসেম্বর সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের এক সভা ছিল। সভা শেষে দুপুর ২টার দিকে দলের কয়েকশ নেতাকর্মী হঠাৎ করে পুরানা পল্টন মোড় ও জিরো পয়েন্ট এলাকায় গিয়ে বসে পড়েন। তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। আড়াইটার দিকে সেখানে হাজির হন শওকত মাহমুদ, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মাদ ইবরাহিম। এদের মধ্যে সাদেক খান সরকারবিরোধী বক্তব্য রাখেন। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের সরে যেতে বলে। তারা স্থান ত্যাগ না করলে লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।
এরপর সন্ধ্যায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শওকত মাহমুদকে শোকজের কথা জানান গণমাধ্যমকে। রাতে আবার মেজর (অব.) হাফিজকে শোকজ করা হয়। এতে বলা হয়, বিএনপি মনে করে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত করে এ ধরনের বিক্ষোভ করার পেছনে আপনাদের হাত রয়েছে। শওকত মাহমুদকে ৭২ ঘণ্টা ও হাফিজউদ্দিনকে পাঁচ দিনের সময় দেওয়া হয় নোটিসের জবাব দেওয়ার জন্য।
পরেরদিন মঙ্গলবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে রিজভী বলেন, ‘ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলার বাইরে কেউ নন। একটা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী কখনই তো দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে পারে না। এটা তো একটা ডিসিপ্লিনের মধ্যে আছে। আমাদের মধ্যে নানা ডিফারেন্স অব ওপিনিয়ন হতে পারে, সেটা হাউজের মধ্যে। ওপেন কোনো জায়গায় তো আমরা কোনো কথা বলতে পারি না।’
তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, ‘দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সাংগঠনিক কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে গঠনতন্ত্রে সুস্পষ্টভাবে লেখা আছে।’
কী কারণে দুজনকে ‘শোকজ’ নোটিস দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, ‘আমরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে উনাদের চিঠি দিয়ে বলেছি কী কারণে শোকজ করা হয়েছে। উনারা জবাব দিক, তারপরে দল যেটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবে।’