বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুর: মামলা করলেন আটক অধ্যক্ষ

কুষ্টিয়ায় ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা করেছেন বাঘা যতীন ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হারুনর রশিদ। তবে এর আগে এ ঘটনায় এর আগে তাকে আটক করে পুলিশ। 

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কুমারখালী কয়া ইউনিয়নে কয়া মহাবিদ্যালয় চত্বরে নির্মিত বাঘা যতীনের ভাস্কর্যে ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা। এরপর শুক্রবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোট চারজনকে আটক করে পুলিশ।

তারা হলেন কয়া বাঘা যতীন ডিগ্রি কলেজের সভাপতি অ্যাড. নিজামুল হক চুন্নু, অধ্যক্ষ হারুনর রশিদ, নৈশ প্রহরী খলিলুর রহমান এবং ১ নম্বর কয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আনিসুর রহমান।

নিজামুল হক চুন্নু আওয়ামী লীগ সমর্থিত উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে এর আগে দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকালে বাঘা যতীন কলেজ চত্বরের আবক্ষ ভাস্কর্যটি ভাঙা দেখে পুলিশকে সংবাদ দেওয়া হয়।

কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মজিবুর রহমান জানান, কয়া বাঘা যতীন ডিগ্রি কলেজ চত্বরে নির্মিত বিপ্লবী বাঘা যতীনের আবক্ষ ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ হারুনর রশিদ বাদী হয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনিসহ চারজনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর তদন্তকাজ শুরু করেছে। যারাই জড়িত থাক তাদের খুব দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার এস এম তানভির আরাফাত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, এ মাসের শুরুর দিকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিতে জেলা প্রশাসন, পুলিশসহ প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তির উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেখানেই ভাস্কর্য আছে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ সব ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু এখানে বাঘা যতীনের আবক্ষ ভাস্কর্যটি আছে সেটা আমাদের জানানো হয়নি। সে কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারেন না। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, মাত্র কয়েক দিন পূর্বে বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনার রেশ থাকতেই আবারও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা বাঘা যতীনের আবক্ষ ভাস্কর্যটি রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা ভাঙল। এটা খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি খুব নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে দোষীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।

কুষ্টিয়ায় আবার ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের নেতা কারশেদ আলম বলেন, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সরকারি দলের নেতাদেরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। এতে বোঝা যায় রাজনীতির মধ্যে ভেজাল আছে এই বিষয়টি প্রশাসন জানে বলেই তাদের ধরেছে। তাদের রাজনৈতিক ভেজালের মধ্যেই ঢুকে পড়েছে মৌলবাদী শক্তি, তারাই ছত্রচ্ছায়ায় থেকে এই আক্রমণগুলি করছে এবং দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাই আমি মনে করি রাজনীতি পরিশুদ্ধ না করলে এই ভাস্কর্য ভাঙা বা ফতোয়াবাজদের দৌরাত্ম্য চলতেই থাকবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কলেজের এক শিক্ষক বলেন, বিষয়টি কেবল মৌলবাদীরা করেছে বলে সেই জায়গায় আটকে থাকলে চলবে না। তাতে উদোড় পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপার সম্ভাবনা থেকে যাবে। এখানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে গ্রুপিং, কোন্দলের জের ধরে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার জন্য ভাস্কর্য ভেঙেছে কি না তাও খতিয়ে দেখার দাবি করেন এই শিক্ষক।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজিবুল ইসলাম খান জানান, বিপ্লবী বীর বাঘা যতীনের মুখ ও নাকের একাংশ ভেঙে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা কুষ্টিয়াতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙার পর আমরা প্রশাসনিক ভাবে যেভাবে দুর্বৃত্তদের আটক করেছি এ ঘটনায়ও খুব দ্রুত দোষীদের খুঁজে বের করা হবে।

যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়(বাঘা যতীন) ছিলেন একজন  ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবী নেতা। তিনি ‘বাঘা যতীন’ নামেই পরিচিত। ভারতে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান রেখেছিলেন।

১৮৭৯ সালে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার কয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৯১৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে বিপ্লবী নেতা বাঘা যতীনের ভাস্কর্যটি তৈরি শেষে উদ্বোধন করা হয়।