উৎপাদন বৃদ্ধি ও পচন ঠেকিয়ে পেঁয়াজে স্বনির্ভর হতে চায় বাংলাদেশ। এজন্য চলতি মৌসুমে প্রায় চার লাখ টন পেঁয়াজ বেশি পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ইতিমধ্যে ৫০ হাজার কৃষককে ২৫ কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। বাড়তি দাম ও প্রণোদনা পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ বেড়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ মৌসুমে ২৯ লাখ ৪৬ হাজার টন পেঁয়াজ পাওয়ার আশা করছে ডিএই। তবে বীজ না পাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন প্রক্রিয়া। এদিকে ঘন কুয়াশার কারণে ব্যাহত হচ্ছে নতুন মুড়িকাটা আগাম পেঁয়াজ তোলার কার্যক্রম। কুয়াশা কেটে গেলেই বাজারে এসব পেঁয়াজ প্রবেশ করবে। সহনীয় হয়ে আসবে দাম।
ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ২৫ লাখ ৫৭ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল। উত্তোলন-পরবর্তী সংরক্ষণজনিত ক্ষতি শতকরা ২৪ ভাগ দিলে প্রকৃত উৎপাদন দাঁড়ায় ১৯ লাখ টন। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের শুরুতেই পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নিয়ে বৈঠক করে ডিএই। ওই বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। বৈঠকে এ মৌসুমের জন্য ২৯ লাখ ৪৬ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় চার লাখ টন বেশি। এর মধ্যে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টন পেঁয়াজ বেশি আসবে। বাকি প্রায় এক লাখ টন আসবে সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে। ডিএই’র মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার সাড়ে ২৯ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। তবে পুরোটা উৎপাদনের মাধ্যমে আসবে না। আমরা উৎপাদন বৃদ্ধি ও পচন রোধে কাজ করছি। এর মধ্যে উৎপাদন করে বাড়তি প্রায় তিন লাখ টন পাব। বাকি এক লাখ টন পচার হাত থেকে রক্ষা করার মাধ্যমে আসবে। আমরা বলব না যে এটা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। আমাদের লক্ষ্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে দেশে যতটুকু চাহিদা সেই পরিমাণ নিট উৎপাদনে যাওয়া। এ সময়ের মধ্যে যে চাহিদা বাড়বে সেটাও আমরা উৎপাদন করতে পারব বলে আশা করছি।’
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫ লাখ টন পেঁয়াজের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে গড়ে ২০-২৫ শতাংশ পচে যায়। সেই হিসাবে দেশে পণ্যটির বার্ষিক নিট চাহিদা ২৬-২৭ লাখ টন। উৎপাদন ঘাটতি থাকায় প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। গত দুই মৌসুম ধরে কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিচ্ছে বাংলাদেশ। এর বড় প্রভাব পড়ে দেশের বাজারে। হুহু করে দাম বেড়ে যায়। সামাল দিতে সরকারকে মিসর, তুরস্ক, চীন ও মিয়ানমার থেকে জরুরি ভিত্তিতে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।
দেশে বর্তমানে যেভাবে পেঁয়াজ সংরক্ষণ হয় তা বিজ্ঞানভিত্তিক নয়। মাচা পদ্ধতিতে ১২ ইঞ্চি পুরু পেঁয়াজ রাখতে পারলে পচন অনেক কম হয়। কিন্তু কৃষকরা ১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত পুরু করে রাখেন। এতে পেঁয়াজের পচন অনেক বেশি হয়। এছাড়া কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয় সেই বিষয়ে অনেক কৃষকেরই জ্ঞানের অভাব আছে। এ কারণেও অনেক পেঁয়াজ পচে যায়। তাই অধিদপ্তর এবার পচন রোধের বিষয়ে জোর দিয়েছেন। সংস্থাটি চাইছে বর্তমানে যে হারে পেঁয়াজ পচে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে তা অন্তত ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে।
বীজ সংকটে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ : দেশে পেঁয়াজের মূল সংকট সৃষ্টি হয় আগস্ট-ডিসেম্বর মাসে। ভারত এ সময়ে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনে সাফল্য দেখিয়েছে। এ কারণে তাদের রপ্তানিতে সমস্যা হলেও অভ্যন্তরীণ সহজেই মিটিয়ে ফেলছে। বাংলাদেশও চাইছে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন করে সংকটকালীন চাহিদা মেটাতে। গত কয়েক বছর ধরে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ডিএই এ নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু মানসম্মত ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে উৎপাদন কার্যক্রমে যেতে পারছে না ডিএই। এখন চেষ্টা চলছে ভারত থেকে বীজ আনার।
এ বিষয়ে মো. আসাদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারত যদি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ দেয় তাহলে তো এ বছরই আমরা উৎপাদনে যেতে পারব। সমস্যা হচ্ছে ভারত এ বীজ দেবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। তারপরও আমরা চেষ্টা করব। এছাড়া অন্য উপায়েও বীজ সরবরাহের চেষ্টা চলছে। আমাদের গবেষণা তো চলছেই। ইনশাআল্লাহ আগামী বছর থেকে আমরা এ পেঁয়াজ উৎপাদনে যাব।
কুয়াশায় ব্যাহত পেঁয়াজ উত্তোলন : দেশে কয়েক দিন ধরে চলমান ঘন কুয়াশার কারণে ব্যাহত হচ্ছে আগাম মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্তোলন। এতে বাজারেও নতুন পেঁয়াজের তেমন সরবরাহ দেখা যাচ্ছে না। মূলত পেঁয়াজ উত্তোলনের পর তা কয়েক ঘণ্টা রোদে শুকাতে হয়। অন্যথায় পেঁয়াজ পচে যাওয়ার হার বেড়ে যায়। তবে আশার কথা হচ্ছে, গত বুধবার থেকে ঘন কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। আগামী সপ্তাহজুড়ে এ অবস্থা চলতে পারে। যাদের পেঁয়াজ পরিপক্ব হয়েছে তারা এ সময়ের মধ্যে নতুন পেঁয়াজ তুলতে পারবেন।
ডিএই’র কর্মকর্তারা বলছেন, কুয়াশায় পেঁয়াজ উত্তোলন করতে না পারলেও তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু বৃষ্টি হলে ক্ষেতের পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য কুয়াশা কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিপক্ব পেঁয়াজ তোলার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া এখনকার মতো থাকলে নতুন বছরেই বাজারে মুড়িকাটা আগাম পেঁয়াজের সরবরাহ অনেক বেড়ে যাবে। এতে পণ্যটির দামও স্বাভাবিক অবস্থায় নেমে আসবে।