পৌষের শুরুতেই দেখা মিলল শীতের তীব্র রূপ। গতকাল শুক্রবার পৌষের চতুর্থ দিন উত্তরাঞ্চলের তিন জেলায় শুরু হয়েছে মৌসুমের প্রথম শৈত্যপ্রবাহ। আপাত মৃদু মাত্রা থাকলেও আজ ও কাল তাপমাত্রা আরও কমে গিয়ে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আরও জেলায় শৈত্যপ্রবাহের বিস্তার লাভ করতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। অধিদপ্তর ও আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলায় গতকাল মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে ৯ ডিগ্রিতে, যা সারা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। শীতের তীব্রতা বাড়ায় উত্তরের জেলাগুলোর জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত শীতকাপড়ের অভাবে অনেকেই আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা।
অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী দুদিন (আজ ও কাল) তাপমাত্রা আরও কমতে পারে। রংপুরের অন্যান্য জেলা এবং রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটের কিছু এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ বিস্তার লাভ করতে পারে। তাপমাত্রা আরও কমে শৈত্যপ্রবাহ মাঝারি মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। তবে এই ধাপে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের শঙ্কা কম। এই শৈত্যপ্রবাহ সপ্তাহখানেক অব্যাহত থাকতে পারে। দিনের তাপমাত্রা কমার বিষয়ে তিনি বলেন, উত্তরের বাতাস বেড়ে যাওয়ায় দিনের তাপমাত্রা কমছে এবং আরও কমতে পারে।
গতকাল রাতের তাপমাত্রা বেশি কমেছে উত্তরের রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে। এ ছাড়া ময়মনসিংহ ও সিলেটেও কমেছে। রংপুরের সব জেলায় রাতের তাপমাত্রা ছিল ১১ ডিগ্রির নিচে। এর মধ্যে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ছিল দেশের সর্বনিম্ন ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও নীলফামারীর ডিমলায় ছিল ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সৈয়দপুর ও কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া রাজশাহীর নওগাঁ, সিলেটের শ্রীমঙ্গল ও ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইলে রাতের তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রির নিচে নেমেছে। অন্যদিকে রাতের পাশাপাশি এদিন প্রায় সারা দেশে দিনের তাপমাত্রাও কমেছে। তুলনামূলক বেশি কমেছে উত্তরাঞ্চলে। সেখানের জেলাগুলোতে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৪ ডিগ্রির নিচে। গতকাল দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে টেকনাফে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল রাজধানীতে রাতের তাপমাত্রা কমার পরিবর্তে উল্টো বেড়েছে। আগের দিনের ১৬ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে গতকাল ছিল ১৭ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে দিনের তাপমাত্রা আগের দিনের চেয়ে প্রায় ২ ডিগ্রি কমে গতকাল ছিল ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাসে অধিদপ্তর জানিয়েছে, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা অব্যাহত থাকতে পারে এবং দেশের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও বিস্তার লাভ করতে পারে। সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দিনের তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে। এ ছাড়া অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা এবং দেশের অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে।
তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস : শীতের তীব্রতার সঙ্গে উত্তরের হিমেল বাতাসে জবুথবু হয়ে পড়েছে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের জনজীবন। টানা চার দিন ধরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করছে জেলার তেঁতুলিয়ায়। গতকাল তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরেই ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে এই জনপদ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের দেখা মিললেও নেই তেমন উত্তাপ। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাসেল শাহ্ জানান, এক সপ্তাহ ধরে আকাশে মেঘ জমে থাকায় এবং কুয়াশা বেড়ে যাওয়ায় দিনের বেলা সূর্য উত্তাপ ছড়াতে পারছে না। যে কারণে তাপমাত্রা ওঠানামা করলেও শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। এদিকে তীব্র শীতে বিপাকে পড়েছে জেলার নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় খড়খুটো জ্বালিয়ে অনেকে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, জেলার শীতার্ত মানুষের জন্য সরকারিভাবে ২১ হাজার ২০০টি কম্বল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। পাঁচ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এগুলো বিতরণ করা হয়েছে।
নীলফামারীর হাসপাতালে বেড়েছে শীতজনিত রোগী : মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে উত্তরের জেলা নীলফামারীতে। শিরশির হিমেল বাতাসে কাবু হয়ে পড়েছে জেলার জনজীবন। শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে গোটা জেলা। দুর্ঘটনা এড়াতে হেড লাইট জ্বালিয়ে সড়কে চলাচল করছে ছোট-বড় যানবাহন। অন্যদিকে শীতের তীব্রতা বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ শীতজনিত রোগ নিয়ে জেলা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে রোগীরা। তাদের মধ্যে শিশু রোগীর সংখ্যা বেশি। রাতের তাপমাত্রা আগের কয়েক দিনের চেয়ে ২-৩ ডিগ্রি কমেছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।
নীলফামারী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. জাকিয়া সুলতানা জানান, শীতের তীব্রতা যতই বাড়ছে, হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা ততই বাড়ছে। গড়ে প্রতিদিন ইনডোর ও আউটডোরে চার থেকে পাঁচ শ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে শিশু রোগীর সংখ্যা বেশি। তারা কোল্ড ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছে।
ডিমলা আবহাওয়া দপ্তরের আবহাওয়া পর্যবেক্ষক মো. মাহমুদুল ইসলাম বলেন, মৃদু শৈত্যপ্রবাহ আরও কয়েক দিন স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. লোকমান হাকীম বলেন, ‘তাপমাত্রা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শীতের তীব্রতা কমবে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জেলার ওপর দিয়ে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
শৈত্যপ্রবাহ বইছে কুড়িগ্রামে : কুড়িগ্রামেও বইতে শুরু করেছে মৌসুমের প্রথম শৈত্যপ্রবাহ। ঘুম থেকে উঠেই কনকনে হুল ফোটানো ঠান্ডার মুখে পড়েন জেলার মানুষজন। দুর্ভোগে পড়েন খেটে খাওয়া দিনমজুর ও ছিন্নমূল মানুষেরা। গতকাল সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যাকে আবহাওয়াবিদরা মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলছেন। কুড়িগ্রাম আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, শুক্রবার সকাল থেকে জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা আরও কমতে পারে। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, এ পর্যন্ত জেলার ৯ উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার মাধ্যমে শীতার্ত মানুষের মাঝে সরকারিভাবে ৩৫ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। নতুন করে প্রত্যেক উপজেলায় শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য ৬ লাখ করে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৯ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন পঞ্চগড় ও নীলফামারী প্রতিনিধি ও কুড়িগ্রাম ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি)