চাই সাহচর্য ও সহযোগিতা

দেশ রূপান্তর-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের ২০ ডিসেম্বর। ঠিক আজকের মতো তীব্র প্রতিকূল না হলেও নতুন দৈনিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরুর সে সময়টা ছিল বিরূপ। ডিজিটাল মাধ্যমের উল্লম্ফন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিপুল বিস্তারের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে, কাগজে ছাপা সংবাদের প্রতাপ ফুরিয়ে আসছে। ডিজিটাল মাধ্যমগুলো সংবাদপত্রের ঐতিহ্য, পেশাদারিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতার বিকল্প হতে পারবে কি-না এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সংবাদপত্র যে তার রূপ ও জৌলুশ নিয়ে আগের মতোই টিকে থাকবে এ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছেন না। শুধু যে সংবাদপত্র পাঠকের মনোযোগ ছাপা কাগজ থেকে ডিজিটাল মাধ্যমের দিকে ঘুরে যাচ্ছে, তা নয়। টেলিভিশনের দর্শক চলে যাচ্ছেন ইউটিউব এবং নেটফ্লিক্স-অ্যামাজনসহ নানা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের দিকে। সিনেমার বড় পর্দা থেকে দর্শক চলে যাচ্ছেন ছোট পর্দার দিকে। দর্শকের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপনদাতাও ছুটছেন নতুন মাধ্যমের দিকে।

এমন পরিস্থিতিতে নতুন একটি সংবাদপত্রের প্রকাশনা শুরু করার সিদ্ধান্ত ছিল কঠিন। যেখানে পুুরনো ও প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলো পাঠক হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত, সেখানে নতুন একটি দৈনিক কীভাবে পাঠকপ্রিয় হতে পারে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছিলাম আমরা।

কিন্তু আমরা ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম। ক্যালকুলেটিভ ঝুঁকি বলতে পারেন। পেশাদার, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সম্পাদকীয় নীতিই ছিল ভরসা। সাংবাদিকতার পরিসর ও মতপ্রকাশের সুযোগ এই সময়ে সীমিত হয়ে আসছে। এসব সীমাবদ্ধতাকে পেশাদারিত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে চেয়েছিলাম আমরা। এক বছরের মধ্যে সে চেষ্টার ফলও পেতে শুরু করেছিলাম। বছর পেরুতে না পেরুতেই দেশ রূপান্তরের পাঠকসংখ্যা আমাদের আশাবাদী করে তুলেছিল। পাঠক ও প্রচারসংখ্যার বিচারে তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসে দেশ রূপান্তর। দেশের বিদ্বৎসমাজ ও নীতিনির্ধারণী মহল পত্রিকাটিকে বিশেষ স্থানে বসিয়েছেন, এর সংবাদ আমলে নিয়েছেন। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ অর্জন সত্যিই উদযাপন করার মতো।

কিন্তু, শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জাঁকালো অনুষ্ঠান পালনের দু’মাস পরেই শুনতে হলো এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ। কভিড-১৯ নামে এক মহামারী এসে পুরো পৃথিবীকে পর্যুদস্ত করে ফেলল। মহামারীতে মৃত্যুর খবরের নিচে চাপা পড়ল অন্যসব খবর। স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের জন্য ভঙ্গুর প্রস্তুতি শুরু হলো মানুষের। একের পর এক শহরে লকডাউন নেমে এলো। বিমানগুলো এয়ারপোর্টে অলস বসে থাকল। আন্তর্জাতিক যোগাযোগে এলো গতিহীনতা। সর্বত্র জেঁকে বসল সন্দেহ, অবিশ্বাস, আতঙ্ক। কর্মজীবীরা কর্মহীন হতে থাকলেন। বাজারে লোকসমাগম কমতে থাকল। বাণিজ্য, ব্যবসা ও বিনিয়োগে নেমে এলো স্থবিরতা। বৈশ্বিক মহামারীর সর্বপ্লাবী আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল বিশ্ব। প্রত্যক্ষ সামাজিক যোগাযোগের ওপর খড়গ নেমে এলো। স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক জীবনযাপন ও মেলামেশায় ছেদ পড়ল। অনির্দিষ্টকালের জন্য নিও-নরমাল বা নতুন স্বাভাবিক আত্মস্থ করার চেষ্টা শুরু হলো। সংবাদপত্র পাঠকের মনে প্রশ্ন তৈরি হলো, সকালবেলার পত্রিকাটি কত হাত ঘুরে ঘরে এসেছে। টাটকা খবর, বিশ্লেষণ ও মতামত পড়ার পর পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজ করতে হবে কি-না। অনেক আবাসিক এলাকায় হকারের প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞা এলো। জেলায় জেলায় সংবাদপত্র সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ল। ভয় উপেক্ষা করে হাসপাতালে হাসপাতালে পিপিই-মাস্ক পরে সংবাদদাতা ও ফটোসাংবাদিকদের প্রাণান্ত চেষ্টা চলতে থাকল। সংবাদকর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ও একের পর এক মৃত্যুর ঘটনার পর চালু হলো হোম অফিস। একদিকে সংবাদকর্মীদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা, অন্যদিকে প্রায় অন্তরীণ গৃহবাসী পাঠককে মহামারীর প্রকৃত সংবাদ জানানোর চ্যালেঞ্জে পড়লাম আমরা।

সংবাদপত্রের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় মহামারীর যে প্রভাব পড়েছে তা থেকে উত্তরণ হয়তো সময়ের ব্যাপার। সংক্রমণের আতঙ্ক কাটলেই পাঠকও ঠিকই ফিরে আসবেন প্রিয় পত্রিকার কাছে। কিন্তু উপার্জনের মূল উৎস যে বিজ্ঞাপন তাতে বিপর্যয় নেমে সংবাদপত্র জগতে গভীর সংকট তৈরি করল। এর ফল হিসেবে অনেক সংবাদপত্রকে ব্যয় সংকোচন এমনকি সংবাদকর্মী ছাঁটাইয়ের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে। দেশ রূপান্তরের অবশ্য সে পথে যাওয়ার উপায় ছিল না। শুরু থেকেই আয় ও ব্যয়ের সুষ্ঠু সমন্বয় নিশ্চিত করতে আমরা মিতব্যয়ী নীতি গ্রহণ করেছিলাম। স্বল্প লোকবল নিয়ে একটি সফল পত্রিকা নির্মাণের পরিণতিতে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই ছিল আমাদের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু করোনাও আমাদের সেই লক্ষ্যে বিচ্যুতি ঘটাল। কিন্তু বিচ্যুত হননি পত্রিকাটির বিনিয়োগকারী জনাব লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল। এই বন্ধুর সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ও ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন তিনি। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তা-সম্পাদক মেলবন্ধন এই পত্রিকার অন্যতম প্রাণশক্তি।

পাঠক দেশ রূপান্তরকে গ্রহণ করেছেন আন্তরিকভাবে। কভিড-১৯ বিস্তারের সময় যখন পত্রিকাগুলোর প্রচারসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছিল তখনো দেশ রূপান্তরের প্রচারসংখ্যার ঊর্ধ্বগতি আমাদের বিস্মিত করেছে। নিজেদের সম্পাদকীয় নীতির প্রতি আরও আস্থাশীল করেছে। মানসম্মত, পেশাদার ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনে আমরা অটল থেকেছি। বড় একটি পাঠকগোষ্ঠী আমাদের আপন করে নিয়েছেন। কিন্তু, সবাই জানেন এর পাশাপাশি নিজ পায়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য প্রয়োজন মজবুত আর্থিক ভিত্তি। এ ভিত্তি তৈরি করতে পারে বিজ্ঞাপন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের অনেক ব্যবসায় মন্দা নেমে আসার প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞাপনেও ব্যয় সংকোচনের নীতি অবলম্বন করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন কমে এসেছে। নতুন পত্রিকা হিসেবে দেশ রূপান্তরকে ভুগতে হচ্ছে অনেক বেশি। বেসরকারি বিজ্ঞাপনের বেশিরভাগ চলে যাচ্ছে ফেইসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে ও ইউটিউবে। সংবাদপত্রগুলোর নির্ভরতা বাড়ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের ওপর। বিজ্ঞাপনের জগতে চলছে এক ধরনের অস্থিরতার দোলাচল। সংবাদপত্রগুলো টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ না ঘটলে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের মূল স্তম্ভ সংবাদপত্রের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। এখন সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতাদের পেশাদার ও সম্ভাবনাময় সংবাদপত্রগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে। বিজ্ঞাপন প্রদানের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের পেশাদারিত্ব ও প্রকৃত প্রচারসংখ্যা যাচাই করাই মানদ- হওয়া উচিত। সংবাদপত্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে যারা প্রকৃত অর্থেই দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করছেন তাদের চিহ্নিত করে পাশে দাঁড়াতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রকৃত প্রচারসংখ্যা বিবেচনায় নিলে দেশ রূপান্তরের প্রতিযোগিতায় ফিরে আসতে সংগ্রাম করতে হবে না।

সংক্রমণ এখনো চলমান। প্রথম ঢেউ ফিকে হতে না হতেই দ্বিতীয় ঢেউ এসে আবার পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের নাগালে ভ্যাকসিন আসার আগ পর্যন্ত অদৃশ্য এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলতেই থাকবে। সমান্তরালে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়েও যাচ্ছে পৃথিবী। ক্ষুধা, মন্দা ও কর্মহীনতা সামনের দিনগুলোতে আরও প্রকট হয়ে উঠবে এমনই আশঙ্কা। করোনাভাইরাসের দিনগুলোর মতো সামনের দিনগুলোতেও অবাধ তথ্যপ্রবাহের প্রয়োজন আরও বাড়বে। সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য মানুষের ক্ষুধা বাড়বে। বড় সংকটে মানুষকে পথ দেখানোর জন্য, সঠিক তথ্য দিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য সংবাদপত্রই এখনো শেষ ভরসা। তাই বৃহত্তর প্রয়োজনে সংবাদপত্রের টিকে থাকার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দরকার।

ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো সংবাদকর্মীরাও মহামারী মোকাবিলার লড়াইয়ে সামনের সারিতে থেকে কাজ করে চলেছেন। সারা দেশের আনাচে-কানাচে থেকে সংবাদ এনে হাজির করছেন পাঠকের সামনে। দেশ রূপান্তরের সংবাদকর্মীরাও ঝুঁকি নিয়ে অক্লান্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। করোনা মহামারী আমাদের অনেক দিক থেকে পিছিয়ে দিলেও পাঠকের হৃদয়ের দিকে অনেক এগিয়ে দিয়েছে। মহামারীর সময়ের এ অভিজ্ঞতা বিরল মানবিক অর্জন হয়ে থাকবে আমাদের।

করোনা দুর্যোগে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে হারাতে হয়েছে আমাদের। সম্মুখসারিতে থেকে রোগীদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা দিতে গিয়ে মারা গেছেন অনেকে। আমরা সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। দেশ রূপান্তরের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই সুযোগে ধন্যবাদ জানাই সব পাঠক, লেখক, সরবরাহ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা এজেন্ট-হকার, বিজ্ঞাপনদাতাকে। তাৎক্ষণিকতার তাড়না মেটানো ছাড়াও তথ্যের আরেক গুণ মননশীলতার ক্ষুধা মেটানো। তাৎক্ষণিক সংবাদ দুনিয়াজুড়ে কোথাও পাঠকের সেই আস্বাদ মেটাচ্ছে না। খবরের পেছনের খবর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের বিকল্প হতে পারেনি তাৎক্ষণিক সংবাদ দেওয়া মাধ্যমগুলো। তাই মুদ্রিত সংবাদপত্রের আবেদন কমেনি। যেমন কমেনি বইয়ের কদর। সেই বিশ্বাস থেকেই আমাদের এই বিরুদ্ধ স্রোতের যাত্রায় আপনার সাহচর্য ও সহযোগিতা চাই। ধন্যবাদ।